নিজস্ব প্রতিবেদন | দক্ষিণ দিনাজপুর

দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার বালুরঘাট থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বোল্লা গ্রাম—এখানেই অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহ্যবাহী বোল্লা কালী মায়ের পুজো। তিন শতাধিক বছরের এই পুজো আজও জেলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, বিশ্বাস ও ভক্তির প্রতীক। প্রতিবছর শুধু দক্ষিণ দিনাজপুর নয়, পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্ত, এমনকি বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটান থেকেও লক্ষাধিক ভক্ত এই পূণ্যভূমিতে সমবেত হন।
এই শুক্রবার শুরু হচ্ছে এবারের বোল্লা মায়ের পুজো, সোমবার বিসর্জন। ইতিমধ্যেই মন্দির প্রাঙ্গণ ও মেলা চত্বর সেজে উঠেছে নিরাপত্তার বলয়ে, প্রস্তুত পুলিশ প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী।
“জয় মা, আমার মা, সবার মা”—এই স্লোগানে গর্বিত বোল্লা
গত কয়েক বছর ধরে “জয় মা, আমার মা, সবার মা, জয় জয় মা”—এই স্লোগানেই মুখর থাকে বোল্লা মায়ের উৎসব। এই স্লোগান যেন এক অনন্য গর্ব—বোল্লা মায়ের পূজা অন্য অনেক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মতো অর্থের বিনিময়ে ‘ভিআইপি দর্শন’-এর পথে হাঁটে না, বরং সমান সুযোগ দেয় সকলকে।
দীর্ঘদিন ধরে বোল্লা মায়ের পুজো ছিল বানিজ্যবিহীন। প্রতিমা দর্শনের ক্ষেত্রে অর্থের বিনিময়ে কোনো প্রথা ছিল না। অবশ্য, শারীরিকভাবে অক্ষম, প্রবীণ বা বিশিষ্ট অতিথিদের জন্য সীমিত বিশেষ দর্শন ব্যবস্থার নজির রয়েছে। তবে তার মধ্যে ধর্ম ব্যবসার গন্ধ ছিল না।
পরিবর্তনের হাওয়ায় শঙ্কা
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পুজোর সাজসজ্জা ও অলঙ্কারে বৈচিত্র্য এসেছে—এটা প্রশংসনীয়। কিন্তু সেই সঙ্গে শোনা যাচ্ছে, এবার থেকে অর্থের বিনিময়ে “ভিআইপি দর্শন” চালুর পরিকল্পনা রয়েছে মন্দির কমিটির। আর এখানেই শুরু হয়েছে বিতর্ক।
স্থানীয়দের মতে, এভাবে প্রতিমা দর্শনের বানিজ্যিকীকরণ শুরু হলে জেলার গৌরবময় ঐতিহ্য কলঙ্কিত হবে। সাধারণ ভক্তের আবেগ, আস্থা ও সমান অধিকারের মূল্যায়ন তখন অর্থের মাপে মাপা হবে—এমন আশঙ্কাই করছে অনেকে।
ঐতিহ্যের মর্যাদা রক্ষার দাবি
স্থানীয় বাসিন্দা ও শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষদের দাবি, মন্দির কমিটি যেন তাদের এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে। প্রশাসনেরও উচিত ঐতিহ্যবাহী এই পুজোকে ধর্মব্যবসার হাতছানি থেকে রক্ষা করা।
প্রতিবছর যেভাবে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ বিভাগ বোল্লা মায়ের উৎসব উপলক্ষে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা করে থাকে, এবারও সেই দক্ষ ব্যবস্থাপনায় সাধারণ ভক্তদের জন্য নির্বিঘ্ন দর্শনের ব্যবস্থা করা সম্ভব বলেই মনে করছেন অনেকে।
সহজ সমাধানের প্রস্তাব
অর্থের বিনিময়ে ভিআইপি দর্শনের পরিবর্তে মন্দিরে কিছু সহজ নিয়ম চালু করা যেতে পারে বলে মত স্থানীয়দের। যেমন—প্রসাদ না ছোঁড়ার বিধি, দর্শন শেষে একদিক দিয়ে প্রবেশ ও অন্যদিক দিয়ে নির্গমনের পথ নির্ধারণ, দর্শন সময়ে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ইত্যাদি। এতে ভিড়ও সামলানো যাবে, এবং ভক্তদের অনুভূতিতেও আঘাত লাগবে না।
উৎসবের আবহ
বোল্লা মায়ের পুজো ঘিরে এলাকা জুড়ে জমে ওঠে বিশাল মেলা। বাইরে থেকে আসা ব্যবসায়ীরা কাঠের আসবাব, লোহার পণ্য, খাবার, খেলনা ও নানা রকম সামগ্রী বিক্রি করেন। এ উৎসবের মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতি যেমন সমৃদ্ধ হয়, তেমনি আত্মীয়তার সম্পর্কেও ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়।
সব মিলিয়ে, বোল্লা মায়ের পুজো শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়—এটি এক আবেগ, এক সংস্কৃতি, এক ঐক্যের প্রতীক।
তাই প্রশাসন ও কমিটির কাছে জনমানসে একটাই আবেদন—
“জয় মা, আমার মা, সবার মা, জয় জয় মা—জয় মা বোল্লা।”
শুক্রবার পুজো, সোমবার বিসর্জন।

