নিজস্ব প্রতিবেদন:
উত্তর দিনাজপুর জেলার চোপড়া ব্লকের মাঝিয়ালী অঞ্চলের ডাঙ্গাপাড়া নতুন হাটে রাস উৎসব মানেই শুধুমাত্র পূজা নয়—সঙ্গে জুড়ে থাকে শতাব্দী প্রাচীন লোকসংস্কৃতির অনন্য উদযাপন। প্রতিবছরের মতো এবারও রাস পূর্ণিমা উপলক্ষে আয়োজিত হল দুই দিনব্যাপী রাসমেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

বুধবার রাতে অনুষ্ঠিত হয় রাসপূজা ও ঐতিহ্যবাহী রাস ঘোরানো। পরদিন, বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হয় মেলা ও গানের আসর। পূর্ব পরম্পরা মেনে বৃহস্পতিবার সারারাত ধরে অনুষ্ঠিত হয় রামায়ণ রাজধারি মুখোশ পালা গান—যা এই অঞ্চলের শতবর্ষেরও বেশি পুরনো লোকসংস্কৃতি।
কাঠের তৈরি মুখোশ পরে কৃত্তিবাসী রামায়ণের সপ্তকাণ্ড অবলম্বনে লোকশিল্পীরা গান ও অভিনয়ের মাধ্যমে তুলে ধরেন রামায়ণের বিভিন্ন পর্বের দৃশ্য। বাংলা ও আঞ্চলিক ভাষার সংমিশ্রণে মঞ্চে জীবন্ত হয়ে ওঠে রাবণ, মহীরাবন, খর-দূষণ, ইন্দ্রজিৎ, সুর্পণখা, হনুমান, এমনকি মা কালী। রঙিন মুখোশে সজ্জিত এই পালা দেখতে ৮ থেকে ৮০—সব বয়সের মানুষ রাতভর ভিড় জমান নতুন হাটের মেলায়।
আয়োজক কমিটির সদস্য সুমন্ত সিংহ, রবিনাথ সিংহ ও ফাতিয়া সিংহ জানান, এবারে তাদের রাসমেলার ১৩৭তম বর্ষ। মেলার উত্তরসূরী মাড়েয়া বীর মোহন সিংহের কথায়, এই ঐতিহ্যবাহী মেলার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন স্বর্গীয় কেঁচারাম সিংহ, আর প্রথম মুখোশ দলের গায়ক ছিলেন স্বর্গীয় সমুচাঁদ সিংহ।
চোপড়া ব্লকের মুখোশ দলের পরিচালক ও প্রবীণ লোকশিল্পী সুবল চন্দ্র গোপ জানান, বহু আগে মাঝিয়ালী অঞ্চলের ডাঙ্গাপাড়া, চন্দনীডাঙ্গা এবং গোয়ালটলি বা উচলগছ গ্রামের লোকশিল্পীরা মিলে গঠন করেছিলেন এই রামায়ণ রাজধারি মুখোশ দলের ভিত্তি। তাঁর কথায়, “একসময় গ্রামের মানুষ এই মুখোশ গানের মাধ্যমেই রামায়ণের কাহিনি জানতে পারত। দশমাথার রাবণের মুখা দেখেই শিশুরা বুঝত—রাবণের দশটি মাথা ছিল।”
তবে বর্তমান ডিজিটাল যুগে এই প্রাচীন শিল্পরূপকে টিকিয়ে রাখা এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। সুবলবাবুর কথায়, “এই দলে প্রায় ৪০-৪৫ জন শিল্পী আছেন। কিন্তু পোশাক, মুখোশ, সাজসজ্জার ব্যয়ভার সামলানো এখন খুব কঠিন। তাই শুধুমাত্র ভালোবাসা ও ঐতিহ্য রক্ষার তাগিদেই আমরা এখনো এই লোকসংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছি।”
শুক্রবার দ্বিতীয় দিনের আসরে পরিবেশিত হয় কৃষ্ণলীলা ও দধিমন্থন পালা, তার পর জীবন্ত দুর্গা বা মের পালা এবং সারারাত ধরে চলে পাঁচালী পালা গান।
ডাঙ্গাপাড়ার এই রাস উৎসব আজও উত্তরবঙ্গের লোকসংস্কৃতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত—যেখানে ভক্তি, শিল্প, ঐতিহ্য ও মানুষের মেলবন্ধনে তৈরি হয় এক জীবন্ত সংস্কৃতির মহোৎসব।

