নারী জাতির মুক্তিতেই জাতির জাগরণ—স্বামী বিবেকানন্দের ভাবনায় আজও প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক :
স্বামী বিবেকানন্দ নারী জাতির মুক্তি ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠাকে কখনওই আলাদা কোনও সামাজিক ইস্যু হিসেবে দেখেননি। তাঁর কাছে নারীর স্বাধীনতা, শিক্ষা ও আত্মসম্মান ছিল জাতির জাগরণের অপরিহার্য ভিত্তি। তাঁর চিন্তা, বক্তব্য ও কর্মধারায় বারবার উঠে এসেছে—নারীকে অবহেলা করে কোনও সমাজ কখনও এগোতে পারে না।

স্বামীজি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, নারী কোনওভাবেই দুর্বল নন; বরং তিনি শক্তির আধার। তাঁর স্পষ্ট উচ্চারণ ছিল, “যে জাতি নারীদের সম্মান করে না, সে জাতির উন্নতি কখনও সম্ভব নয়।” নারীকে তিনি ‘শক্তি’ রূপে কল্পনা করতেন, যাঁর উপর সমাজ ও জাতির ভিত্তি দাঁড়িয়ে থাকে।

নারী মুক্তির প্রধান পথ হিসেবে তিনি শিক্ষাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তাঁর মতে, নারীদের শিক্ষা হতে হবে তাদের নিজস্ব ভাষায় ও প্রয়োজন অনুযায়ী। এই শিক্ষা কেবল পুঁথিগত জ্ঞান নয়, বরং আত্মনির্ভরতা ও আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলার মাধ্যম। স্বামী বিবেকানন্দ মনে করতেন, একজন শিক্ষিত মা-ই পারে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সঠিক মূল্যবোধে গড়ে তুলতে।

নারীর জন্য করুণা নয়, সমান অধিকার ও সুযোগ—এই দাবিতেই ছিলেন তিনি অনড়। তাঁর ভাষায়, “নারী ও পুরুষ সমাজের দুই চাকা; একটি চাকা দুর্বল হলে সমাজ এগোতে পারে না।” সমাজের অগ্রগতির জন্য নারী-পুরুষের সমতা যে অপরিহার্য, তা তিনি বারবার তুলে ধরেছেন।

ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতার ক্ষেত্রেও নারীদের পূর্ণ অধিকার সমর্থন করতেন স্বামীজি। প্রাচীন ভারতের গার্গী ও মৈত্রেয়ীর উদাহরণ দিয়ে তিনি দেখিয়েছিলেন, জ্ঞান ও তত্ত্বচর্চায় নারী কোনও অংশেই পুরুষের থেকে কম নন। একইসঙ্গে বাল্যবিবাহ, পর্দাপ্রথা এবং নারীর উপর সামাজিক অত্যাচারের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন তীব্র কণ্ঠস্বর। তাঁর মতে, নারীর অশিক্ষা ও পরাধীনতা নারীর দোষ নয়, বরং সমাজের দীর্ঘদিনের গড়ে তোলা অন্যায় ব্যবস্থার ফল।

স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে রামকৃষ্ণ মিশন ও সারদা মিশনের মাধ্যমে নারী শিক্ষা, বিধবা পুনর্বাসন, স্বাস্থ্য ও সমাজসেবামূলক নানা উদ্যোগ বাস্তব রূপ পায়, যা নারী ক্ষমতায়নের পথকে সুদৃঢ় করেছে।

এই ভাবনারই প্রতিফলন দেখা গেল সম্প্রতি শিলিগুড়ির এস এফ রোডে অবস্থিত মাহেশ্বরী সেবা সদনে। মা সারদার আবির্ভাব তিথি উপলক্ষে শ্রী সারদা সংঘ, শিলিগুড়ি টাউন শাখার উদ্যোগে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে স্বামী বিবেকানন্দের চিন্তায় নারী জাতির অভ্যুত্থান নিয়ে সুগভীর বক্তব্য রাখেন গবেষক সুতপা শর্মা ব্যানার্জী। তাঁর আলোচনায় নারীদের মুক্তির লক্ষ্যে স্বামী বিবেকানন্দের প্রচেষ্টার বহু অজানা দিক উঠে আসে।

প্রতি বছর ১২ জানুয়ারি স্বামী বিবেকানন্দের জন্মদিন জাতীয় যুব দিবস হিসেবে পালন করা হলেও, নারী জাতির মুক্তি ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে আমরা বাস্তবে কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পেরেছি—তা আজ নতুন করে ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শ আজও নারী অধিকার, শিক্ষা ও আত্মসম্মানের লড়াইয়ে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও প্রেরণাদায়ক।