নিজস্ব প্রতিবেদন :
একুশে ফেব্রুয়ারি শুধু আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস নয়, আধ্যাত্মিক জগতে এই দিনটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ—এই দিনেই আবির্ভূত হয়েছিলেন শ্রী মা, অর্থাৎ মীরা আলফাসা (Mirra Alfassa)। পন্ডিচেরীর শ্রী অরবিন্দ আশ্রমে যাঁকে সবাই শ্রদ্ধাভরে “শ্রী মা” বলে ডাকতেন, তিনি ছিলেন শ্রী অরবিন্দের সাধনার একনিষ্ঠ সহায়িকা ও আধ্যাত্মিক সহযোগিনী।

পন্ডিচেরী নিবাসী শ্রী অরবিন্দ অনুরাগী ও চিন্তাবিদ অশোক রায় জানান, “শ্রী অরবিন্দ নিজেই বলেছেন— ‘আমার সাধনা কখনোই সম্পূর্ণ হতো না যদি শ্রী মা না থাকতেন।’ শ্রী মা ছিলেন তাঁর সাধনার শক্তিরূপ, তাঁর হ্লাদিনী শক্তি।”
১৮৭৮ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি প্যারিসে জন্মগ্রহণ করেন মীরা আলফাসা। শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে ছিল আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানের গভীর আকাঙ্ক্ষা। নানা সাধনা ও অধ্যয়নের মধ্য দিয়ে তিনি ১৯১৪ সালে প্রথমবার ভারতে আসেন এবং শ্রী অরবিন্দের সান্নিধ্যে পৌঁছান। পরবর্তীতে ১৯২০ সালে স্থায়ীভাবে পন্ডিচেরীতে বসবাস শুরু করেন। শ্রী অরবিন্দ তাঁকে তাঁর আধ্যাত্মিক সাধনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গ্রহণ করেন।
শ্রী মা শুধু একজন আধ্যাত্মিক সাধিকা নন, তিনি ছিলেন এক সংগঠক ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মানবতাবাদী চিন্তক।১৯৫০ সালে শ্রী অরবিন্দের মহাসমাধির পর তিনি আশ্রমের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং আশ্রমকে একটি সুসংগঠিত আধ্যাত্মিক ও শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলেন। তাঁর উদ্যোগেই প্রতিষ্ঠিত হয় শ্রী অরবিন্দ আন্তর্জাতিক শিক্ষা কেন্দ্র (Sri Aurobindo International Centre of Education)।
১৯৬৮ সালে তাঁরই প্রেরণায় গড়ে ওঠে ‘অরোভিল’—এক আন্তর্জাতিক মানব ঐক্যের নগরী, যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষ জাতি-ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে উঠে একসঙ্গে বসবাস ও সাধনা করেন। অরোভিল আজও বিশ্বভ্রাতৃত্বের এক অনন্য উদাহরণ
।শ্রী মা বিশ্বাস করতেন মানুষের চেতনার বিবর্তনে। তাঁর বাণীতে বারবার উঠে এসেছে অন্তরের পরিবর্তন, আত্মশুদ্ধি ও ঈশ্বরীয় চেতনার জাগরণের কথা। তাঁর মতে, “সত্যিকারের পরিবর্তন বাইরে নয়, ভিতর থেকে শুরু হয়।”
একুশে ফেব্রুয়ারির প্রাক্কালে শ্রী মাকে স্মরণ করে অশোক রায় বলেন, “শ্রী মা আমাদের শিখিয়েছেন ভক্তি ও কর্মের সমন্বয়। সংসারেই সাধনা, কর্মেই ঈশ্বরভাব—এই দর্শনের বাস্তব রূপ তিনি নিজের জীবনে তুলে ধরেছেন।”আজকের বিভাজিত ও অস্থির বিশ্বে শ্রী মা-র জীবন ও বাণী নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
তাঁর আদর্শ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আধ্যাত্মিকতা মানে পালিয়ে যাওয়া নয়, বরং জীবনকে ঈশ্বরীয় চেতনার আলোয় রূপান্তরিত করা।একুশে ফেব্রুয়ারির এই পবিত্র আবির্ভাব তিথিতে শ্রী মাকে জানাই শ্রদ্ধা ও প্রণাম।

