নিজস্ব প্রতিবেদক :
গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শনে শ্রাদ্ধ কেবল একটি সামাজিক বা পারিবারিক আচার নয়—এটি আত্মার কল্যাণ ও ভগবানের কৃপা প্রার্থনার এক গভীর আধ্যাত্মিক কর্ম। রবিবার ১১ জানুয়ারি শিলিগুড়ি দেশবন্ধু পাড়ার শ্রী শ্রী নরোত্তম গৌড়ীয় মঠে প্রয়াত কনা দত্তের আদ্যশ্রাদ্ধ উপলক্ষে এই বিষয়টিই বিশেষভাবে ব্যাখ্যা করেন মঠের মহারাজ ভক্তিনলয় স্বামী জনার্দন।

মহারাজ বলেন, অনেক সময় দেখা যায় সাধারণ গৃহে অনুষ্ঠিত শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে অনেকে আহার গ্রহণ করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন। এর পেছনে সামাজিক ধারণা, কুসংস্কার কিংবা ‘শ্রাদ্ধের খাবার’ নিয়ে এক ধরনের মানসিক দ্বিধা কাজ করে। কিন্তু গৌড়ীয় মঠে অনুষ্ঠিত শ্রাদ্ধ সম্পূর্ণ ভিন্ন দর্শনের উপর প্রতিষ্ঠিত।
বৈষ্ণব মতে, যখন শ্রাদ্ধানুষ্ঠান ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নামসংকীর্তন, পূজা ও অর্পণের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়, তখন সেই আহার আর সাধারণ ভোজন থাকে না।
মহারাজের কথায়—“ভগবানের উদ্দেশ্যে নিবেদিত হলে সবই প্রসাদে রূপান্তরিত হয়। সেখানে ভোগ বা আহার নয়, কৃপা গ্রহণ করা হয়।”
গৌড়ীয় মঠে শ্রাদ্ধকালে—
প্রথমে ভগবানের উদ্দেশ্যে ভোগ নিবেদন করা হয়।
হরিনাম সংকীর্তন ও প্রার্থনার মাধ্যমে পিতৃলোকের শান্তি কামনা করা হয়।এরপর সেই নিবেদিত ভোগ সকলের মধ্যে বিতরণ করা হয়।এই প্রক্রিয়ায় আহার ভগবানের কৃপায় পরিশুদ্ধ হয়ে প্রসাদে পরিণত হয়।
গৌড়ীয় বৈষ্ণব মতে, আত্মা চিরন্তন—“ন হন্যতে হন্যমানেশরীরে”অর্থাৎ দেহ নষ্ট হলেও আত্মা বিনষ্ট হয় না।
শ্রাদ্ধের মাধ্যমে মূলত প্রয়াত আত্মার জন্য ভগবানের শরণাপন্ন হওয়া হয়, যাতে তাঁর যাত্রাপথ সুগম হয় এবং পরবর্তী গতি কল্যাণময় হয়। বৈষ্ণব দর্শনে বিশ্বাস করা হয়,
ভগবানের প্রসাদ গ্রহণ করলে কেবল জীবিত মানুষেরই নয়, প্রয়াত আত্মারও পুণ্যলাভ হয়।
শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর বলেছেন— “পিতৃ তর্পণের সর্বোচ্চ রূপ হলো ভগবানের সন্তুষ্টি সাধন।”
এই ভাবনাতেই গৌড়ীয় মঠে শ্রাদ্ধকে শোকের নয়, বরং ভক্তি ও কৃতজ্ঞতার উৎসব হিসেবে দেখা হয়।
মহারাজ আরও বলেন,
“যেখানে হরিনাম আছে, যেখানে ভগবানের প্রসাদ আছে—সেখানে অশুচিতা থাকতে পারে না।”
অতএব গৌড়ীয় মঠে শ্রাদ্ধ উপলক্ষে প্রসাদ গ্রহণ কোনো অশুভ বা নিষিদ্ধ বিষয় নয়, বরং তা ভগবানের কৃপা লাভের এক বিশেষ সুযোগ।শিলিগুড়ির গৌড়ীয় মঠে অনুষ্ঠিত এই আদ্যশ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান আবারও স্মরণ করিয়ে দিল—
শ্রাদ্ধ মানে কেবল অতীতের স্মরণ নয়, বরং ভগবানের শরণ নিয়ে ভবিষ্যতের কল্যাণের পথ প্রশস্ত করা।
এখানে আহার নয়—প্রসাদ, শোক নয়—ভক্তি, আর বিদায় নয়—আত্মার চিরন্তন যাত্রার জন্য প্রার্থনাই মূল দর্শন।প্রসঙ্গত দীর্ঘদিন রোগ ভোগের পর ৮৬ বছর বয়সে গত ৩০ ডিসেম্বর প্রয়াত হন কনা দত্ত।
শিলিগুড়ি দেশবন্ধু পাড়ায় তিনি তাঁর জামাতা বিপ্লব সেনগুপ্তের বাসভবনে পরলোকগমন করেন।গত দুর্গাপূজার সময়ে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর থেকে তাঁর জামাতা বিশিষ্ট শিক্ষক,আইনজীবী ও সমাজসেবী বিপ্লব সেনগুপ্ত এবং নাতি কানপুর আই আই টির প্রতিভাবান গবেষক ঋকপ্রতীক সেনগুপ্ত তাঁকে বাঁচানোর জন আপ্রাণ প্রয়াস চালান।
তাদের অকৃত্রিম শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং পরিশ্রমের জেরে মৃত্যু মুখ থেকে ফিরে আসেন কনাদেবী। দেশবন্ধু পাড়ার বাড়িতে আই সি সি ইউ তৈরি করে তাঁকে সুস্থ রাখার অনবরত প্রয়াস চলতে থাকে।কিন্তু গত ৩০ ডিসেম্বর আর শেষ রক্ষা হয়নি,শীতের দাপট বৃদ্ধি পেলে সকলকে কাঁদিয়ে অমৃতলোকে যাত্রা করেন কনাদেবী।বহু বছর আগে কনাদেবীর কন্যা সন্তান পূবালী সেনগুপ্ত সদ্যোজাত শিশু পুত্রকে রেখে পৃথিবী থেকে বিদায় নেন।
এরপর পূবালী সেনগুপ্তের সদ্যোজাত পুত্র সন্তানকে কোলেপিঠে মানুষ করার দায়িত্ব নেন কনাদেবী।আর পূবালী সেনগুপ্তের স্বামী বিশিষ্ট শিক্ষক ও সমাজসেবী বিপ্লব সেনগুপ্ত পূবালী সেনগুপ্ত স্মৃতি সংস্থা গঠন করে অঙ্কন প্রতিযোগিতা এবং সমাজসেবার মাধ্যমে এক দৃষ্টান্ত তৈরি করেন।
বহু ছেলেমেয়ে বিপ্লববাবু বৈপ্লবিক কাজে উদ্বুদ্ধ হয়ে সমাজসেবার কাজে নামেন আর যে মাতৃহারা যে শিশুকে কোলেপিঠে বড় করে তোলার দায়িত্ব নেন কনাদেবী সেই শিশু পুত্র আজ কানপুর আই আই টির প্রতিভাবান গবেষক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে, ঋকপ্রতীক সেনগুপ্ত।
কিন্তু গর্ভদাত্রী মা-কে সেভাবে দেখতে না পারলেও কোলেপিঠে একেবারে মায়ের মতো স্নেহে বড় করে তোলা,দিদিমা ” কনামা”কে কখনো ভুলতে পারবেন না ঋকপ্রতীক। তাই কনামার কথা মনে পড়লেই তাঁর চোখ চিকচিক করে ওঠে। মহাকাশ বিজ্ঞানী মহলে সুনাম অর্জন করে নেওয়া বিজ্ঞানী ঋকপ্রতীক যেন এখন মহাকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে আর খুঁজে বেড়ান কনা-মাকে।

