নিজস্ব প্রতিবেদক :
মানবদেহের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলির মধ্যে কিডনি অন্যতম। রক্তকে পরিশোধন করা, শরীরের অতিরিক্ত জল ও ক্ষতিকর বর্জ্য পদার্থ বের করে দেওয়া, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করা এবং শরীরের লবণ-জলের ভারসাম্য বজায় রাখতে কিডনির ভূমিকা অপরিসীম। তাই এই অঙ্গকে সুস্থ রাখা প্রত্যেক মানুষের জন্য অত্যন্ত জরুরি। বিশেষজ্ঞদের মতে, দৈনন্দিন জীবনের কিছু সহজ অভ্যাস মেনে চললে কিডনিকে দীর্ঘদিন ভালো রাখা সম্ভব।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পর্যাপ্ত পরিমাণে জল পান করা। সাধারণভাবে প্রতিদিন প্রায় দুই থেকে তিন লিটার জল পান করলে শরীরের ভেতরের বিষাক্ত উপাদান সহজে বের হয়ে যায় এবং কিডনির ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে না। তবে যাদের আগে থেকেই কিডনি সংক্রান্ত সমস্যা রয়েছে বা অন্য কোনও শারীরিক জটিলতা আছে, তাঁদের অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী জল গ্রহণ করা উচিত।
খাদ্যাভ্যাসের দিকেও সচেতন হওয়া প্রয়োজন। অতিরিক্ত লবণ, তেল-মশলাযুক্ত খাবার, ফাস্টফুড বা প্রক্রিয়াজাত খাদ্য বেশি খাওয়া কিডনির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তার বদলে নিয়মিত শাকসবজি, ফল, ডাল, মাছ এবং সুষম খাদ্য গ্রহণ করলে শরীর সুস্থ থাকে এবং কিডনিও ভালো থাকে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ করলে রক্তচাপ বাড়তে পারে, যা কিডনির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।রক্তচাপ এবং রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখাও কিডনির সুস্থতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস কিডনি বিকল হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে ধরা হয়। তাই নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা অত্যন্ত জরুরি।
একই সঙ্গে নিয়মিত শরীরচর্চাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রতিদিন হাঁটা, হালকা ব্যায়াম কিংবা যোগব্যায়ামের অভ্যাস শরীরকে সক্রিয় রাখে এবং কিডনির ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ কমায়।চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবন করাও বিপজ্জনক হতে পারে। অনেক সময় দীর্ঘদিন ধরে ব্যথানাশক ওষুধ বা কিছু অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করলে কিডনির ক্ষতি হতে পারে। তাই প্রয়োজন ছাড়া ওষুধ খাওয়ার অভ্যাস থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা।
এর পাশাপাশি ধূমপান ও অতিরিক্ত মদ্যপান থেকেও দূরে থাকা দরকার। এগুলি কিডনির রক্তনালিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এবং ধীরে ধীরে কিডনির কার্যক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা কিডনি রোগ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। বিশেষ করে যাদের পরিবারে কিডনি রোগের ইতিহাস রয়েছে, অথবা যারা ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন, তাঁদের বছরে অন্তত একবার কিডনি পরীক্ষা করানো উচিত।
এই প্রেক্ষাপটে প্রতি বছর মার্চ মাসের দ্বিতীয় বৃহস্পতিবার বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব কিডনি দিবস। ২০২৬ সালের ১২ মার্চ দিনটি বিভিন্ন স্থানে পালিত হয়েছে কিডনির স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে। এবারের মূল প্রতিপাদ্য ছিল “Kidney Health for All — Caring for People, Protecting the Planet”।
এই দিবসের প্রধান উদ্দেশ্য হলো কিডনি রোগ সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করা, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করার গুরুত্ব তুলে ধরা এবং সুস্থ জীবনযাপন ও নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বার্তা পৌঁছে দেওয়া। বিশ্বজুড়ে নানা হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এদিন ফ্রি চেক-আপ ক্যাম্প, সচেতনতা সভা ও সেমিনারের আয়োজন করা হয়।
উত্তরবঙ্গের শহর শিলিগুড়িতেও এদিন সচেতনতার বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া হয়। “খবরের ঘন্টা”-র মাধ্যমে মানুষের উদ্দেশে কিডনি স্বাস্থ্য সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেন বিশিষ্ট বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডাঃ শীর্ষেন্দু পাল। তাঁর মতে, বর্তমানে পরিবেশ ও প্রকৃতির দূষণও কিডনির ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। তাই সুস্থ জীবনযাপন, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং সচেতনতা—এই তিনটি বিষয় কিডনি সুস্থ রাখার জন্য অত্যন্ত জরুরি

