রাজবংশী ভাষা নিয়ে অনন্য গ্রন্থ প্রকাশ করলেন ভারতীয় বায়ুসেনার অবসরপ্রাপ্ত উইং কমান্ডার

নিজস্ব প্রতিবেদন :
রাজবংশী ভাষার বাক্যাংশ, প্রবাদ ও ধাঁধাকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত হয়েছে বিশাল আকারের একটি গবেষণাধর্মী গ্রন্থ— “ফ্রেসেস,ইডিয়মস এন্ড রিডলস অফ রাজবংশী ল্যাঙ্গুয়েজ” যার বাংলা অর্থ : “রাজবংশী ভাষার বাক্যাংশ, প্রবাদ এবং ধাঁধা”)। মোট ৮২৪ পৃষ্ঠার এই বইটি ইতিমধ্যেই ভাষা ও সংস্কৃতি মহলে বিশেষ আগ্রহের সৃষ্টি করেছে।

বইটি প্রকাশ করতে খরচ হয়েছে প্রায় ৮ লক্ষ টাকা। গ্রন্থটির মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২৩৯৫ টাকা। এই বৃহৎ কাজের মধ্যে স্থান পেয়েছে প্রায় ২৫০০টি ছিলকা ও ছোল্লক, যার মধ্যে ১৫০০টি কবিতা। রাজবংশী ভাষায় মূল রচনাগুলির সঙ্গে দেওয়া হয়েছে বাংলা ও ইংরেজি অনুবাদ, যাতে গবেষক ও সাধারণ পাঠক— উভয়েই সহজে বিষয়বস্তু বুঝতে পারেন। বইটি মোট ৬টি অধ্যায়ে বিভক্ত।

এই বইয়ের রচয়িতা ডঃ রঞ্জিত কুমার মন্ডল যিনি ভারতীয় বায়ুসেনার অবসরপ্রাপ্ত উইং কমান্ডার। তিনি টানা চার বছর ধরে নিরলস পরিশ্রম করে এই গ্রন্থটি প্রস্তুত করেছেন। তাঁর জন্ম কোচবিহার জেলার দিনহাটার হোকদহ গ্রামে। দিনহাটাতেই তাঁর শৈশব ও বেড়ে ওঠা।

বর্তমানে তিনি বেঙ্গালুরুতে বসবাস করেন এবং সেখান থেকেই বইটির অধিকাংশ কাজ সম্পন্ন করেছেন। পাশাপাশি শিলিগুড়ির কলেজপাড়ায় তাঁর একটি ফ্ল্যাট রয়েছে।
গত ডিসেম্বর মাসে দিল্লি প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বইটির আনুষ্ঠানিক প্রকাশ করা হয়।

অনুষ্ঠানে বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব উপস্থিত ছিলেন। লেখক ডঃ রঞ্জিত কুমার মন্ডল শুধু একজন প্রাক্তন বায়ুসেনা কর্মকর্তা নন, তিনি একজন সামাজিক ও শিক্ষা বিষয়ক গবেষক হিসেবেও পরিচিত।তিনি শিলিগুড়ির কলেজপাড়ার ফ্ল্যাটে বসেই “খবরের ঘন্টা”-কে জানান, এই বই প্রকাশের জন্য ইতিমধ্যেই ৩১ জানুয়ারি কলকাতায় বর্মন ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে তিনি একটি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেছেন।

রাজবংশী একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষা, যা ভারতের পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এই ভাষা সেই জনগোষ্ঠীর, যাদের এই বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডে বসবাসের ইতিহাস খ্রিস্টপূর্ব দশম শতকেরও আগে পর্যন্ত পৌঁছে যায়। ঐতিহাসিকভাবে কোচ রাজবংশের প্রশাসনিক ভাষাও ছিল রাজবংশী। প্রায় পঞ্চদশ শতাব্দী থেকে ভারতের স্বাধীনতা পর্যন্ত এই রাজবংশের শাসনকাল বিস্তৃত ছিল।

রাজবংশী ভাষার রয়েছে নিজস্ব সাহিত্য ও সংস্কৃতি, যা কেবল রাজবংশী জনগোষ্ঠীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়— বরং এই অঞ্চলে বসবাসকারী বহু মানুষের ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। রাজবংশী সংস্কৃতি মূলত সেই সব মানুষের সংস্কৃতি, যারা এই ভাষায় কথা বলেন।এই গ্রন্থে সংকলিত প্রবাদ, বাক্যাংশ ও ধাঁধাগুলি শুধু ভাষার উপাদান নয়— বরং সমাজজীবনের মূল্যবান দলিল বলেই মনে করেন লেখক।

তাঁর মতে, বর্তমানে পৃথিবীতে প্রায় ৬ কোটি মানুষ রাজবংশী ভাষায় কথা বলেন এবং রাজাদের আমল থেকেই এই ভাষা যথেষ্ট সমৃদ্ধ।বইটিতে আলোচিত ছিলকা ও ছোল্লকগুলির মূল উদ্দেশ্য হলো সমাজের মানুষকে নৈতিক শিক্ষা প্রদান করা— যাতে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবন সুস্থ ও সুন্দর হয়ে ওঠে। ভাষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই গ্রন্থে সমাজজীবনের একটি সমগ্র চিত্র ফুটে উঠেছে।

গ্রন্থের বিষয়বস্তুর মধ্যে রয়েছে প্রকৃতি ও পরিবেশ, কৃষি জীবন, হাস্য-কৌতুক, রাজনীতি, সামাজিক কু-রীতির উপর ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ ইত্যাদি। পাশাপাশি ছিলকা ও ছোল্লকের মাধ্যমে মানুষের জীবনের নানা দিক— যেমন ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ভূগোল, ইতিহাস, আধ্যাত্মিকতা, দর্শন ও মানববিদ্যা— তুলে ধরা হয়েছে।

দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও গবেষকরাও বইটির প্রশংসা করেছেন। লেখক জানিয়েছেন, তিনি শীঘ্রই জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়, ইগনু এবং দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে এই বই নিয়ে নিজের বক্তব্য উপস্থাপন করবেন।

মোবাইল, ইন্টারনেট ও এআই-নির্ভর যুগে যখন বইয়ের বাজার নানা প্রশ্নের মুখে, তখন ৮ লক্ষ টাকা ব্যয়ে একটি ভাষা ও সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে এত বড় গ্রন্থ প্রকাশ সত্যিই বিভিন্ন মহলে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই উদ্যোগকে অনেকেই রাজবংশী ভাষা ও সংস্কৃতির সংরক্ষণে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলেই মনে করছেন।