মহাশিবরাত্রি: আরাধনা, আস্থা ও মানবসেবার এক সমন্বিত বার্তা

নিজস্ব প্রতিবেদন :
হিন্দুধর্মের এক অত্যন্ত পবিত্র ও তাৎপর্যপূর্ণ তিথি হলো শিবরাত্রি । এই দিন উপবাস, রাত্রিজাগরণ, জপ–ধ্যান ও প্রার্থনার মাধ্যমে ভক্তরা শিবের আরাধনায় ব্রতী হন। শিবলিঙ্গে জল ও দুধ নিবেদন এই পূজার প্রধান আচারগুলির মধ্যে অন্যতম। তবে এর পাশাপাশি উঠে আসে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—আচার পালনের মধ্যেই কি পূজা সম্পূর্ণ, নাকি মানুষের সেবাতেই নিহিত রয়েছে প্রকৃত উপাসনার সারবত্তা?

শিবলিঙ্গে জল–দুধ নিবেদনের তাৎপর্য
পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, সমুদ্র মন্থনের সময় সৃষ্ট হালাহল বিষ পান করে মহাদেব বিশ্বকে রক্ষা করেছিলেন। সেই তাপ প্রশমনের প্রতীক হিসেবেই শিবলিঙ্গে শীতল জল ঢালার রীতি প্রচলিত। দুধ পবিত্রতা, শান্তি ও ভক্তির প্রতীক হিসেবে নিবেদন করা হয়। শিবলিঙ্গ সৃষ্টিশক্তির চিরন্তন রূপ—সেখানে অর্ঘ্য প্রদান মানে জীবনের উৎসের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন।

একই সঙ্গে জল নিবেদন আত্মশুদ্ধি ও অহং ত্যাগের বার্তাও বহন করে।ধর্মগ্রন্থ ও সাধকবাণী বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়—শুধু আচার নয়, মানবিক আচরণই ধর্মের মূল সুর। ক্ষুধার্তকে অন্নদান, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো কিংবা পশুপাখির সেবা—এসবকেই ‘শিবজ্ঞানে জীবসেবা’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অনেকের মতে, অপচয় না করে সেই দুধ–জল যদি অভাবগ্রস্ত মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হয়, তাতেই মহাদেব সন্তুষ্ট হন।

এবারের শিবরাত্রিতে শিলিগুড়ির বিভিন্ন মন্দিরে দেখা যায় ভক্তদের উচ্ছ্বাস ও ভিড়। রাত অবধি মা-বোনেরা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে শিবলিঙ্গে জল ও দুধ অর্পণ করেন। বিশেষ করে শিলিগুড়ি সারদাপল্লী ইচ্ছাময়ী কালিবাড়ি চত্বরে ছিল চোখে পড়ার মতো ভক্তসমাগম।

এই উপলক্ষে শিলিগুড়ি সম্পর্ক গনেশ পূজা কমিটির সহ সম্পাদক নবারুণ সাহা ওরফে বাপ্পা-র নেতৃত্বে বিকাল থেকেই শুরু হয় প্রসাদ বিতরণ কর্মসূচি। উপস্থিত ছিলেন ইচ্ছাময়ী কালিবাড়ির সভাপতি কৃষ্ণপদ সাহা, সহ সভাপতি সনৎ ভৌমিক, সম্পাদক সুকুমার সাহা ও সহ সম্পাদক প্রভাস চন্দ্র সাহা। তাঁদের বক্তব্য, সারা বছর জুড়েই মন্দিরে নানা ধর্মীয় ও সেবামূলক কর্মসূচি আয়োজন করা হয়, শিবরাত্রি তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

শিবরাত্রি শুধু আচার পালনের দিন নয়, এটি মঙ্গল, দয়া ও মানবিকতার চর্চারও সময়। শিব মানেই মঙ্গল—তাই প্রকৃত শিবপূজা তখনই সম্পূর্ণ হয়, যখন আমরা সমাজে কল্যাণের বার্তা ছড়িয়ে দিই এবং মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করি।এই পবিত্র তিথিতে প্রার্থনা একটাই—
“ওঁ নমঃ শিবায়” জপের সঙ্গে সঙ্গে মানবতার পথেও দৃঢ় অঙ্গীকার হোক।