নিজস্ব প্রতিবেদন:
ভ্রমণের টানে নয়, গড়ে তোলার প্রত্যয় নিয়েই উত্তরবঙ্গে পা রেখেছেন ২৬ বছরের তরুণ শাক্য সিনহা। কলকাতার সাদার্ন এভিনিউয়ের বাসিন্দা শাক্য তিন বছর আগে আইন পড়ার উদ্দেশ্যে শিলিগুড়ির দাগাপুরে একটি আইন কলেজে ভর্তি হন। পড়াশোনার পাশাপাশি এখানকার সমাজবাস্তবতা তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।

শাক্য লক্ষ্য করেন, সহজ–সরল উত্তরবঙ্গের মানুষ বহু ক্ষেত্রেই নিজেদের ন্যায্য অধিকার সম্পর্কে সচেতন নন। শিক্ষা ও সচেতনতার অভাবের কারণেই অনেকেই প্রাপ্য অধিকার আদায় করতে পিছিয়ে পড়ছেন।
এই বাস্তবতা থেকেই জন্ম নেয় এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। গত সেপ্টেম্বর মাসে শাক্য শিলিগুড়ির দাগাপুর এলাকায় একটি উন্মুক্ত গ্রন্থাগার তৈরির উদ্যোগ নেন। পঞ্চনই নদীর ধারে, একটি রাস্তার পাশের পাঁচ রাস্তার মোড়ে, এক দোকানের পাশে গড়ে উঠেছে এই লাইব্রেরি। বই পড়ার এই ছোট্ট পরিসর আজ ধীরে ধীরে হয়ে উঠছে এলাকার মানুষের মিলনকেন্দ্র।
গ্রন্থাগার তৈরিতে দেশের নানা প্রান্তের মানুষ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন—যা নিঃসন্দেহে এক নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত। শাক্য জানান, “আমি বড় কিছু করার দাবি করছি না, শুধু একটি ছোট আলো জ্বালাতে চেয়েছি। ভবিষ্যতে এই আলোই হয়তো বড় আন্দোলনের রূপ নেবে।”
ইতিমধ্যেই বহু মানুষ এখান থেকে বই পড়তে ও নিয়ে যেতে শুরু করেছেন। স্কুলপড়ুয়ারা ফুচকা খাওয়ার ফাঁকেই বই তুলে নিচ্ছে—এই দৃশ্য যেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়, “যেখানে আলোর পথ আছে, সেখানেই মানুষ আপনিই এগিয়ে যায়।”
শিক্ষিত না হয়েও এই উদ্যোগের অন্যতম সহযোদ্ধা হয়ে উঠেছেন এক ফুচকাওয়ালা। তাঁর কথায়, আজকের প্রজন্ম মোবাইলের নেশায় ডুবে যাচ্ছে, তাই নতুন করে বইয়ের নেশা ধরানো জরুরি। এই ভাবনায় যেন বিদ্যাসাগরের শিক্ষাদর্শনের প্রতিধ্বনি শোনা যায়—“শিক্ষাই মানুষের প্রকৃত মুক্তি।”
শাক্যের বিশ্বাস, বই পড়ে শিশু থেকে বৃদ্ধ সকলেই সচেতন হলে মানুষ সরকারি দপ্তরে নিজেদের অধিকার দাবি করতে শিখবে। এতে প্রশাসনিক দুর্নীতি কমবে, বঞ্চনা ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে মানুষ রুখে দাঁড়াতে পারবে। তাঁর কথায় উঠে আসে স্বামী বিবেকানন্দের সেই আহ্বান—“জাগো, ওঠো এবং লক্ষ্য না পৌঁছানো পর্যন্ত থেমো না।”
এই গ্রন্থাগারে শুধু মূলধারার বই নয়, উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জনজাতির জীবন ও ভাষায় লেখা বইও স্থান দেওয়া হবে। এতে নিজেদের সংস্কৃতি ও পরিচয় নতুন করে জানতে পারবেন এলাকার মানুষ। এই উদ্যোগ যেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর আদর্শকেই স্মরণ করিয়ে দেয়—“নিজের শক্তির উপর বিশ্বাস রাখো, তবেই বিশ্ব জয় করা সম্ভব।”
শাক্য সিনহার এই ছোট্ট প্রচেষ্টা আজ উত্তরবঙ্গে সচেতনতার এক নতুন দিশা দেখাচ্ছে। ঘুরতে নয়, গড়তে এসেছেন—এই বার্তাই বইয়ের পাতায় পাতায় ছড়িয়ে পড়ছে শিলিগুড়ির দাগাপুরে।

