নিজস্ব প্রতিবেদন: শ্যামা পূজার আগে সোমবার সকাল থেকেই ব্যস্ততার আবহ দেখা যায় জলপাইগুড়ির গোশালা মোড় এলাকায়। অতি প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী দেবী চৌধুরানী শ্মশান কালী মন্দিরে পূজোর প্রস্তুতি শুরু হয় সকাল থেকেই। মন্দিরের পুরোহিতকে মা কালীর অলংকার পরানোর কাজে ব্যস্ত দেখা যায় । সকাল থেকেই ভক্তদের আনাগোনায় মুখরিত হয়ে ওঠে মন্দির চত্বর। দূরদূরান্ত থেকে এমনকি শিলিগুড়ি থেকেও বহু ভক্ত আসেন দেবী দর্শনে।

দিনের আলোতেও চারিদিকে যেন ছড়িয়ে থাকে এক রহস্যময় গা ছমছমে আবহ। সন্ধ্যা নামলেই নিঝুম হয়ে যায় পরিবেশ। আজও এই শ্মশান কালীপুজোয় বলির প্রথা প্রচলিত। দেবীর কাছে নিবেদন করা হয় শোল ও বোয়াল মাছসহ আমিষ ভোগ। মায়ের এক হাতে রক্তমাখা নরমুণ্ড, অন্য হাতে সূরাপাত্র— কিন্তু তাঁর হাতে নেই কোনো অস্ত্র। প্রাচীন রীতি মেনেই আজও দেবীর পূজায় সূরা নিবেদন করা হয়।
মন্দির ঘিরে রয়েছে দীর্ঘ শতাব্দীর ইতিহাস ও লোককথা। চারদিকে ঘন জঙ্গল, পাশে বয়ে চলা রুকরুকা নদী আর লাগোয়া শ্মশান— সব মিলিয়ে রহস্যময় এই পরিবেশ যেন দেবীর শক্তির প্রতীক। স্থানীয়দের মতে, একসময় এই নদীপথেই বজরায় চড়ে পুজো দিতে আসতেন দেবী চৌধুরানী নিজে। সেই তাঁর হাত ধরেই শুরু হয়েছিল এই পুজো। প্রথমদিকে বটগাছের তলায় অনুষ্ঠিত হতো বিশালাক্ষী রূপে মাতৃসাধনা, যা করতেন ডেঙ্গুয়াঝাড় চা-বাগানের আদিবাসীরা।
পরে কিছু বছর পুজোর দায়িত্ব নেয় জলপাইগুড়ির রাজপরিবার। কিন্তু ঘন জঙ্গলের মধ্যে পুজো আয়োজন কঠিন হয়ে পড়ায় তারা সরে দাঁড়ান। এরপর স্থানীয় বাসিন্দারাই নিজেদের উদ্যোগে পুজোর দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে বর্তমানের পাকা মন্দির। মন্দিরের যেখানে এখন দেবীর বিগ্রহ স্থাপিত, একসময় সেখানে ছিল বিশাল এক কপিকল। কথিত আছে, সেটি ঘোরালেই খুলে যেত এক গুহার দরজা, যা সুড়ঙ্গপথে জলপাইগুড়ির পান্ডাপাড়ায় পৌঁছে যেত। মন্দির চত্বর জুড়ে আজও সেই প্রাচীন গুহার চিহ্ন মেলে।
পুরনো সূত্রে জানা যায়, রুকরুকা নদীতে বজরা নোঙর করার জন্য একসময় বিশাল লোহার আংটা বসানো থাম ছিল। মন্দির প্রাঙ্গণে এখন যে প্রাচীন বটগাছটি দেখা যায়, ইংল্যান্ডের এক উদ্ভিদবিজ্ঞানীর পরীক্ষায় তার বয়স প্রায় চার শতাব্দীরও বেশি বলে দাবি করেছে মন্দির কমিটি। সেই কারণে, মন্দির ও বটগাছ— উভয়কেই হেরিটেজ সাইট হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানিয়েছে তারা।
এই মন্দিরের ইতিহাসে এক গা ছমছমে অধ্যায়ও রয়েছে। কথিত আছে, একসময় এখানেই থাকতেন নয়ন নামে এক কাপালিক, যিনি পাতু দাস নামে এক ব্যক্তিকে বলি দেন। পরবর্তীতে ১৮৯০ সালে তাঁর ফাঁসি হয়— সেই তথ্য জলপাইগুড়ি জেলের নথিতেও সংরক্ষিত রয়েছে। মন্দিরের ভিতরে আজও রয়েছে পঞ্চমুণ্ডির আসন, যেখানে কৌশিকী অমাবস্যার রাতে সাধনায় বসেন তান্ত্রিকরা।
প্রতি বছরই উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা ছাড়াও অসমসহ বহু জায়গা থেকে ভক্ত ও পর্যটকরা আসেন এই মন্দিরে পূজা দিতে।
মন্দির কমিটির সম্পাদক দেবাশিস সরকার জানান, “এই মন্দিরের সঙ্গে দেবী চৌধুরানীর ঐতিহাসিক যোগ রয়েছে। রুকরুকা নদী করলার সঙ্গে যুক্ত, যা গিয়ে মিশেছে তিস্তায়। সেই নদীপথেই বজরায় চড়ে মা কালীর পূজো করতে আসতেন দেবী চৌধুরানী।”
মন্দিরের পুরোহিত সুভাষ চৌধুরীর ভাষায়, “অন্যত্র সাধারণত দক্ষিণাকালীর পুজো হলেও, এখানে মা শ্মশানকালী রূপে বিরাজমান। তাই তাঁর হাতে অস্ত্র নয়, এক হাতে নরমুণ্ড, অন্য হাতে সূরাপাত্র। ভোগে অবশ্যই থাকে শোল ও বোয়াল মাছ, এবং পুজোর রাতে পাঁঠা বলিরও রীতি রয়েছে। সেই বলির মাংসই দেবীর ভোগে নিবেদন করা হয়।”
আগে মাটির মূর্তি স্থাপিত থাকলেও, ১৯৯৭ সালে রাজস্থানের জয়পুর থেকে আনা কষ্টিপাথরের মূর্তির প্রতিষ্ঠা হয়। তারপর থেকে সেই মূর্তিতেই চলছে দেবী চৌধুরানী শ্মশান কালী মন্দিরের পূজা।
পুরনো ইতিহাস, লোকগাঁথা ও বিশ্বাসে মোড়া এই মন্দির আজও জলপাইগুড়ির ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক অনন্য প্রতীক হয়ে রয়েছে।

