ছট পুজোর তাৎপর্য কি

নিজস্ব প্রতিবেদন: দুর্গা পুজো,কালী পুজোর শেষে এখন গুরুত্বপূর্ণ উৎসব হলো ছট পুজো। সবাই এখন তাকিয়ে ছট পুজোর। কিন্তু এই পুজোর তাৎপর্য কি, চলুন জেনে নেওয়া যাক।ছট বা“ছট্ট” শব্দটি আসলে ষষ্ঠ বা ষষ্ঠী দিনে করতে হয় এমন বলেই, সংখ্যাগত ‘ছয়’র সঙ্গে জড়িত — শব্দটি এসেছে প্রাকৃত বা মৈথিলী ভাষার “ষষ্ঠী” থেকে।

এই উৎসব মূলত সূর্য দেব বা সূর্য এবং ষষ্ঠী মাইয়া অর্থাৎ ছ’ষ্ঠী দেবী-কে আরাধনায় উৎসর্গীকৃত।কারণ হলো সূর্যই জীবনের ভিত্তি — আলো, গরম, উদ্ভিদ, জীবজন্তু সবকিছুকে সন্তুষ্ট রাখে। তাই মানুষ এই পুজোর মাধ্যমে সূর্যদেবকে কৃতজ্ঞতা জানায় সুস্বাস্থ্য ও সমৃদ্ধি কামনায়।

কিছু পুরানো কথা ও রীতি অনুযায়ী, উৎসবটি বহু প্রাচীন — ঋগ্বেদ-র যুগ থেকে সূর্য-উপাসনার ধারার সঙ্গে যুক্ত।
এই ছট পুজোর তাৎপর্য রয়েছে অনেক। প্রথমত এই পুজো আত্মনিয়ন্ত্রণ ও শুদ্ধতার চিহ্ন: উদ্যেগ, নির্জলা উপবাস, নদীতে পবিত্র স্নান, সংহিতা অনুসরণ ইত্যাদি দিয়ে বিশেষ শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে বরণ করা হয় এই পুজোয়।
প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ: পাহাড়, নদী, সূর্যচুম্বিত সময় — সন্ধ্যা ও প্রাতঃকাল — এ সময়ে জীববিজ্ঞান ও মানসিক ভাবনায় বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে বলে বিবেচিত।

⭕সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধন: ঘাটে-ঘাটে বহু মানুষ একসঙ্গে হয়, বন্ধুবান্ধব ও পরিবারের সঙ্গে মিলিত হয়, উৎসব-আনন্দ ভাগ করে নেয়।
⭕পরিবেশ-অনুভবনায়ক: অন্য অনেক উৎসবের মতো এখানে বড় মাত্রায় মূর্তি বিসর্জন, প্লাস্টিক, শব্দদূষণ ইত্যাদি কম হয়; শুদ্ধ উপকরণ, নদী-তীর, কখনও কখনও উঠোন-চাষ উপকরণ ব্যবহৃত হয়।
⭕পরিবেশ ও ছটপুজোর সম্পর্ক:
নদী-তীর বা পুকুর তীরে উদযাপন হওয়ার কারণে → সূর্যাস্ত-সূর্যোদয়ের সময় বিশুদ্ধ বাতাস, ছায়া-আলো, শান্ত পরিবেশ অবলম্বন হয়।

মূর্তি বা ভারী ধাতব উপহার কম, অধিকাংশ উপকরণ হলো তরিতরকারি, শস্য, ফল, আগাছা, বেত স্যুটের ব্যাগ ইত্যাদি — প্রাকৃতিক ও সহজ। তাই “ইকো-ফ্রেন্ডলি উৎসব” হিসেবে অনেক উৎসাহী ছট পুজো নিয়ে আলোচনা করেন।

সকালের সূর্যালোকে এবং সন্ধ্যার আলোচক্রে দাঁড়িয়ে উপাসনা — এমন সময় সূর্যর কিরণ সরাসরি চোখ বা মস্তিষ্কে বিশেষ প্রভাব ফেলতে পারে বলে ভারতের বিভিন্ন উৎস বলা হয়েছে।
এছাড়া, এই পুজো আয়োজনের সময় ঘাট, নদী কাচা না হলে বিশৃঙ্খলা হয় — তাই অনেক জায়গায় “ঘাট পরিষ্কার রাখুন”, “লাইট না ওভারে ব্যবহার করুন” ইত্যাদি পরিবেশ সচেতনতার বার্তা দেওয়া হয়।সংক্ষেপে বলতে হয়, প্রকৃতি-উপকরণ-মানসিক শান্তি-উপবাস-নদী-সূর্য — এক সংমিশ্রণে উৎসবটি পরিবেশ-সংবেদনশীল ভাব অর্জন করেছে।

⭕২০২৫ সালের ছট পুজোর তিথি — শুরু ও সমাপ্তি
এই বছরের জন্য এই উৎসব চারদিন ধরে পালন হবে: ২৫ অক্টোবর ২০২৫ (শনিবার) থেকে ২৮ অক্টোবর ২০২৫ (মঙ্গলবার) পর্যন্ত।প্রতিদিনের রীতি ও তারিখ:
২৫ অক্টোবর — প্রথম দিন : নাহায়-খায় অর্থাৎ নহা-খায়। হোলি স্নান করে প্রথম খাবার গ্রহণ করা হয়।
২৬ অক্টোবর — দ্বিতীয় দিন : খরনা বা কর্ণা। দিনভর নির্জলা উপবাস, সন্ধ্যায় উৎসব অনুষ্ঠিত হয়।
২৭ অক্টোবর — তৃতীয় দিন : সন্ধ্যা অর্ঘ্য বা ডুবন্ত সূর্যকে অর্পণ বা শ্রদ্ধা নিবেদন ।
২৮ অক্টোবর — চতুর্থ দিন : ভোরে অর্ঘ্য এবং পারণ বা আগামী দিনে ওঠা সূর্যকে অর্পণ ও উপবাস ভঙ্গ।

⭕উল্লেখযোগ্য: শুদ্ধ তিথি অনুযায়ী, শুদ্ধ ষষ্ঠী তিথি এবার শুরু ২৭ অক্টোবর ভোরে ৬ টা চার মিনিটে এবং তা শেষ হচ্ছে ২৮ অক্টোবর সকাল ৭টা ৫৯ মিনিটে।
⭕লাউ ভাত, খরনা প্রভৃতি শব্দ কেন ব্যবহার হয়?
লাউ ভাত বা কদু ভাত: প্রথম দিন “নাহায়-খায়” তে শুদ্ধভাবে দুপুরে একটাই সহজ খাবার রাখা হয় — সাধারণত লাউ যা বেঁচে থাকা বড় সবজি এবং ভাত ও চানা ডালের সঙ্গে। উদাহরণস্বরূপ: “কদ্দু-ভাত” বা বড়ই বা লাউ-সবজি ভাত ব্যবহৃত হয়।
কারণ: এই খাবারটি সহজ, হালকা, সেই উপবাস-রীতি শুরু করার আগে দেহকে প্রস্তুত করে।
নামটি লৌকিক ভাষায় প্রচলিত: “লাউ” বানবাটি সবজি এবং “ভাত” বা চাল মিশিয়ে।
⭕খরনা : এই শব্দটি পুরোহিত বা উৎসব রীতি থেকে এসেছে, দ্বিতীয় দিনে নির্জলা উপবাস শেষে সন্ধ্যায় চিনি বা গুড় দিয়ে তৈরী মিষ্টান্ন ও রুটি ভাতে উপবাস ভঙ্গ হয়।
সন্ধ্যায় খাওয়া প্রসাদ হওয়ার হেতু নামকরণ হয়েছে “খরনা”।
⭕কি কি হয় (দিনে-দিনে রীতি):
প্রথম দিন (নাহায়-খায়): পুণ্যস্নান, ঘর ও রান্নাঘর পরিষ্কার, একটি শুদ্ধ খাবার গ্রহণ।
দ্বিতীয় দিন (খরনা): দিনভর উপবাস (অনেক ক্ষেত্রে জল ছাড়া), সন্ধ্যায় প্রসাদ প্রস্তুত ও দেওয়া হয়।
তৃতীয় দিন (সন্ধ্যা অর্ঘ্য): সন্ধ্যায় নদী/জলাশয়ে গিয়ে ডুবন্ত সূর্যের দিকে অর্ঘ্য দেওয়া হয়, ঘাট সাজানো হয়, শাঁকসবজি, ফল, গুড়, চিনি, গম আদি উপহার হয়।
চতুর্থ দিন (উষা অর্ঘ্য এবং শেষ ভঙ্গ: ভোরে উঠে উদয়মান সূর্যের উদ্দেশ্যে অর্ঘ্য দেওয়া হয়, এরপর উপবাস ভাঙা হয়, পরিবার-বন্ধুদের সঙ্গে প্রসাদ গ্রহণ ও উৎসব শেষ হয়।
এই সব রীতিতে খাদ্য, উপবাস, পানাহার নিয়ন্ত্রণ, জলাশয়ে অবস্থান, পবিত্রতা – সব মিলিয়ে একটি সামগ্রীক আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা তৈরী হয়।
⭕ কেন ছট পুজোর ঠেকুয়া এত জনপ্রিয়
ঠেকুয়া একটি দইহীন, গুড় / জ্যাগরি ও গমের আটা দিয়ে তৈরি ডিপ-ফ্রায়েড স্ন্যাক, যা ঋগ্বেদ যুগের খাবারের রূপধারণ বলেও বলা হয়।
উৎসব-উপহার ও প্রসাদের অংশ হিসেবে এর গুরুত্ব: ঠেকুয়া দীর্ঘক্ষণ সংরক্ষণ করা যায়, তাই উৎসব আগে তৈরি করে রাখা সহজ।
ঠেকুয়া-র মাধ্যমে উৎসবের পরিচিতি ও স্বাদ দুটোই সহজে পৌঁছে যায় — “ছট” মানেই ঠেকুয়া-সহ পুরনো -প্রথা।

বর্তমানে ঠেকুয়ার জনপ্রিয়তা বাড়ছে — স্বাস্থ্যকর সংস্করণ, বিভিন্ন ফ্লেভার, শহর-ব্যাপী অনলাইন অর্ডার ইত্যাদি হচ্ছে।
সংক্ষেপে: ঠেকুয়া শুধু একটি মিষ্টি নয় — ছট উৎসবের আবেগ, স্মৃতি, সংস্কার ও ভোগের সঙ্গে ওতপ্রোত যুক্ত।