ভালোবাসার জোরে জীবনযুদ্ধ: মৃত্যুকে হার মানাতে লড়ছেন ঈপ্সিতা, পাশে অটল সূর্যদীপ্ত

নিজস্ব প্রতিবেদন :
একেই হয়তো সত্যিকারের লড়াই বলা যায়। এক শরীরে একের পর এক অস্ত্রোপচার, আট বছরে আটবার অপারেশন, আর সামনে অপেক্ষা করছে নবমবারের কঠিন চিকিৎসা। তবুও হার মানতে নারাজ ৩১ বছরের গৃহবধূ ঈপ্সিতা কুন্ডুদাস। যন্ত্রণা তাঁকে থামাতে পারেনি, বরং আরও শক্ত করে তুলেছে তাঁর বেঁচে থাকার ইচ্ছেকে।

২০১৭ সালে সামাজিক মতে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন কোচবিহার জেলার মেখলিগঞ্জের বাসিন্দা ও পেশায় প্যারাটিচার সূর্যদীপ্ত দাস এবং হলদিবাড়ির মেয়ে ঈপ্সিতা কুন্ডুদাস। বিয়ের কিছুদিনের মধ্যেই অসুস্থ হয়ে পড়েন ঈপ্সিতা। বাবা-মা কেউই বেঁচে নেই, ফলে একে অপরই হয়ে ওঠেন তাঁদের একমাত্র আশ্রয়।

২০১৮ সাল থেকে শুরু হয় ঈপ্সিতার কঠিন চিকিৎসা-যাত্রা। ইতিমধ্যেই তাঁর শরীরে আটবার অস্ত্রোপচার হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে স্পাইনাল টিউমারের অপারেশন, নার্ভে প্লেট বসানো এবং ইউরোস্টমি—এই তিনটি বড় অস্ত্রোপচার। পাশাপাশি কিডনিতে পাথর, হাতে ফিস্টুলা, পার্মাক্যাথ, গলায় দু’বার চ্যানেল বসানোসহ আরও পাঁচটি ছোট অপারেশনও সম্পন্ন হয়েছে।

বর্তমানে তাঁর দুটি কিডনিই অকেজো। নিয়মিত ডায়ালিসিসই এখন তাঁর বেঁচে থাকার একমাত্র ভরসা। শিলিগুড়ির শিবমন্দির এলাকায় ভাড়া বাড়িতে থেকে একটি বেসরকারি নার্সিংহোমে চলছে চিকিৎসা। কিন্তু নতুন করে দেখা দিয়েছে গুরুতর সমস্যা—ডায়ালিসিসের জন্য বুকে যে পথ তৈরি করা হয়েছে, তার পাশের রক্তনালীগুলি সরু হয়ে ব্লক হয়ে যাচ্ছে। ফলে শরীরে রক্ত জমে যাচ্ছে, বাড়ছে শ্বাসকষ্ট ও হৃদস্পন্দনের গতি।

চিকিৎসকদের মতে, দ্রুত “পারকুটানিয়াস ট্রান্সলুমিনাল অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি” করানো জরুরি, যাতে ডায়ালিসিস স্বাভাবিকভাবে চালানো যায়। এই অস্ত্রোপচারের জন্য প্রয়োজন প্রায় দেড় লক্ষ টাকা। আগের মতো এবারও চেন্নাইতেই হবে চিকিৎসা।

কিন্তু অর্থের অভাব এখন সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইতিমধ্যেই চিকিৎসার পেছনে খরচ হয়েছে প্রায় ১৫ লক্ষ টাকা। সূর্যদীপ্ত দাস তাঁর মেখলিগঞ্জের দুটি জমি বিক্রি করে দিয়েছেন, ঈপ্সিতাও নিজের সমস্ত সোনার গয়না ত্যাগ করেছেন। সমাজের বহু মানুষ সাহায্যের হাত বাড়িয়েছেন, তবুও এখনও প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় হয়নি।

চেন্নাইয়ের চিকিৎসকেরা অনেক আগেই কিডনি প্রতিস্থাপনের পরামর্শ দিয়েছিলেন, কিন্তু আর্থিক সঙ্কটের কারণে তা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে তাঁর শরীরে বিশেষ চ্যানেলের মাধ্যমে প্রস্রাবের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং পাইপের সাহায্যে তা করতে হচ্ছে।

এত কষ্টের মধ্যেও ঈপ্সিতা কেন বেঁচে আছেন? তাঁর উত্তরে ফুটে ওঠে ভালোবাসার গভীরতা—
“আমি যদি মরে যাই, আমার স্বামীকে কে দেখবে? ওর তো আপনজন কেউ নেই। আমি ওকে ভালোবাসি।”
আর সূর্যদীপ্ত দাস? কেন তিনি সব হারিয়েও স্ত্রীর পাশে অটল? তাঁর উত্তরও ততটাই সহজ, ততটাই গভীর—

“ভালোবাসার জন্যই। আমার স্ত্রীর কেউ নেই। আমি ওকে ছেড়ে দিলে ওকে দেখবে কে? আমি বিশ্বাস করি, সবার আশীর্বাদে আমার স্ত্রী আবার সুস্থ হবে, আমরা আবার সুখের সংসার গড়ব।”

আজকের দ্রুত বদলে যাওয়া সময়ে, যেখানে সম্পর্ক অনেক সময়ই ভঙ্গুর হয়ে পড়ে, সেখানে এই দম্পতির ভালোবাসা, ধৈর্য এবং সংগ্রাম এক বিরল দৃষ্টান্ত।এই লড়াই শুধু এক পরিবারের নয়—এটি মানবিকতারও পরীক্ষা। একটু সহানুভূতি, একটু সাহায্য হয়তো ফিরিয়ে দিতে পারে একটি জীবনের হাসি।

সহযোগিতার জন্য গুগল পে নম্বর: 6296429116
ভালোবাসা, আশাবাদ আর মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ইচ্ছাই পারে এই লড়াইকে জয়ের গল্পে পরিণত করতে।