নিজস্ব প্রতিবেদন:
প্রিয় ভাই-বোনদের স্মরণীয় সম্পর্কের উৎসব ভাইফোঁটা বা ভ্রাতৃদ্বিতীয়া । শুধু এবারে উৎসব নয় — এইবার বিশেষভাবে ভাবতে চাই একান্ত দুর্যোগে, নিরাশ্রয় হয়ে পড়া অনেক বোনের কথা, বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের পাহাড় ও ডুয়ার্স অঞ্চলে সম্প্রতি বন্যা ও ভূমিধসে বিপর্যস্ত মানুষ-সমাজের কথা। এই প্রেক্ষাপটে ভাইফোঁটার আয়োজনকে আরও অর্থবহ ও মানবিকভাবে উদযাপন করার ধারণা নিয়ে এই প্রতিবেদনটি ।

ভাইফোঁটা উৎসবের উদ্ভব-উৎস ও তাৎপর্য অনেক পুরনো। এর মধ্যে রয়েছে:
শাস্ত্রীয়ভাবে, কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয় তিথিতে ভ্রাতৃদ্বিতীয়া ভাই-বোনের মধুর সর্ম্পক উদযাপিত হয়।
প্রচলিত পৌরাণিক কাহিনিতে বলা হয়, শ্রীকৃষ্ণ তাঁর বোন সুভদ্রা-র কাছে জয়টিকা পরিয়ে মিষ্টি খেয়েছিলেন — তখন থেকেই এই রীতি চালু হয়েছে বলেও বিবেচনা করা হয়।
অন্য এক মতে, মৃত্যুর দেবতা যমরাজ ও তার বোন যমুনা-র মধ্যে সম্পর্কের প্রতীক হিসাবেও ভ্রাতৃদ্বিতীয়া পালিত হয়।
এভাবে, এই উৎসব এমন এক সময়ের প্রতীক যেখানে বোন ভাইয়ের দীর্ঘায়ু, সুখ ও মঙ্গল কামনায় ফোঁটা বা চন্দন, কাজল, ধান-দূর্বা সহ দিয়ে সম্পর্ক মজবুত করার রীতি রয়েছে।
আধ্যাত্মিক ও সামাজিক তাৎপর্যও রয়েছে ভাই ফোঁটার।
আধ্যাত্মিক: ভাই-বোনের মধ্যে স্নেহ, দায়িত্ব ও শুভকামনার বন্ধন প্রকাশ পায়। বোন তার ভাইয়ের কপালে ফোঁটা দিয়ে মঙ্গল কামনা করে, ভাই প্রতিজ্ঞা করে বোনের প্রতি সুরক্ষা ও সহমর্মিতার।
সামাজিক: ঘর-পরিবার, সমাজ ও সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক জোরদার হয়। একজন ভাই-বোনের জন্য রয়েছে ভক্তি, শ্রদ্ধা ও ভাইদের কাছে দায়িত্ববোধের অনুভূতি।
মানবিক দৃষ্টিকোণ: বিশেষ করে আজ-কাল, যেখানে বিপর্যয়, দুর্যোগ ও জনসাধারণের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়, এই উৎসব শুধু পারিবারিক আনুষ্ঠানিকতা নয় — এটি একটি সুযোগ হয়ে দাঁড়ায় মানুষকে পাশে দাঁড়ানোর, সমাজের দুর্বল ও বিপর্যস্ত সদস্যদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করার।
ভাই ও বোনের যিনি সম্পর্ক, তিনি এই উৎসবের মাধ্যমে তা প্রমাণ এবং উদযাপন করে।
এটি একটি শুভ সময় যেখানে বোন তার ভাইকে শুভকামনা জানায়, আর ভাই তার বোনকে সুরক্ষা ও মর্যাদার প্রতিশ্রুতি দেয় — যা পারিবারিক স্থিতিশীলতা ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধি করে।
আজ-কাল যেমন সমাজে একাকীত্ব, দুর্যোগ, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে — সেখানে ভাইফোঁটা আমাদের মনে করিয়ে দেয় পারস্পরিক দায়িত্ব, সহমর্মিতা ও সমবেদনার কথা।
বিপর্যস্তদের প্রতি আমাদের চেতনায় থাকলে এই উৎসব শুধু আমাদের পরিবারের নয়, “সমাজ” হয়ে উঠতে পারে। আমরা শৈল্পিকভাবে উৎসবের মধ্যে মানবিকতাও বিলিয়ে দিতে পারি।
২০২৫ সালে ভাইফোঁটার তিথি ও সময়সূচি হলো মূলত নিম্নরূপঃ
তিথি বা দ্বিতীয়ায় (ভ্রাতৃদ্বিতীয়া) শুরু হয়: ২২ অক্টোবর ২০২৫ (বুধবার) রাতে ৮টা ১৮ মিনিট থেকে।
এই তিথি শেষ হবে ২৩ অক্টোবর ২০২৫ (বৃহস্পতিবার) রাত প্রায় ১০টা ৪৬ মিনিটে।
অনেক পঞ্জিকা মতে শুভ মুহূর্ত অংশিকভাবে দুপুরেও রয়েছে — যেমন ২৩ অক্টোবর দুপুর ১টা ১৩ মিনিট থেকে বিকাল ৩টা ২৮ মিনিট পর্যন্ত শুভ সময়।
সুতরাং, ২০২৫-এ সবচেয়ে উপযুক্ত দিন হিসেবে ধরা হচ্ছে ২৩ অক্টোবর ২০২৫ (বৃহস্পতিবার) দিনটি — তবে ২২ রাত থেকেই তিথি চলতে পারে, তাই উৎসব সন্ধ্যার পর থেকেই আয়োজন শুরু করা যেতে পারে।
উত্তরবঙ্গের দুঃস্থ অবস্থায় অতিরিক্ত মানবিক উদ্যোগ
উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি ও ডুয়ার্স অঞ্চল সম্প্রতি বন্যা ও ভূমিধসের মধ্যে পড়েছে। বহু ভাই-বোন, বিশেষ করে বোনেরা নিরাশ্রয় হয়ে পড়েছেন। এই পরিস্থিতিতে ভাইফোঁটার সময়ে একটু মন বদলে, একটু বাড়তি মনোযোগ দেবার আহ্বান রইছে:
বোনেরা তাদের ভাইদের ফোঁটা দেওয়ার সময়, সেই উৎসব-ময় মুহূর্তটিকে শুধু ব্যক্তিগত আনন্দের জন্য নয় — ভাবতে পারেন যা তারা নিজেদের মধ্যেকার বন্ধনকে বেশি অর্থ দিয়ে তৈরি করবে।
ভাইরা এই দিনে তাদের বোনদের শুধু উপহার দেবেন না, বরং সেই সমাজের, উৎসব-ভবনের বাইরেও, যাদের ভরসা প্রয়োজন — তাঁদের জন্যও উপহার ও সহায়তা নিয়ে ভাবতে পারেন।
উৎসবের দিন আপনি ও আপনার বোন, আপনার এলাকার, বা আশেপাশের যাঁরা দুঃস্থ হয়েছেন, বোনেদের হাতে ছোট্ট ফোঁটা উপহার হিসাবে দিতে পারেন — যেমন রিলিফ কিট, ত্রাণসামগ্রী শুষ্ক খাবার, শুকনো ফল, লাইট ওয়েট কম্বল, ওষুধের ছোট খুদে প্যাকেট অথবা উৎসবের মিষ্টি-প্যাকেটসহ স্নেহবহুল প্যাকেজ।
এইভাবে, ভাইফোঁটা শুধু পারিবারিক উদযাপন নয়, হয়ে উঠবে সামাজিক সমবায় ও মানবিক সহমর্মিতার জন্য একটি কার্যকর পদ্ধতি। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের বিপর্যস্ত এলাকায় এটি একটি সান্ত্বনার হাত হবে — “তুমি ভুলে যেয়োনি”, “আমরা তোমার পাশে আছি” এই মনের বার্তা পৌঁছে দেওয়া যাবে।
বোনের হাতে উপহার দেবার সময় ছোট একটি কার্ড-নোট রাখতে পারেন, যাতে লেখা থাকবে: „ভাইফোঁটার শুভেচ্ছা — তোমার দীর্ঘায়ু ও মঙ্গল কামনায়, এবং প্রয়োজনে আমরা পাশে আছি।” এতে উৎসবের আনন্দের সঙ্গে মানবিক সংযোগও গড়ে উঠবে।
২০২৫ সালের ভাইফোঁটা এবার শুধু একটি উৎসব নয় — একটি উপলক্ষ যাতে আমরা পারি আমাদের ভাই-বোনের সঙ্গে সম্পর্কের বন্ধনকে নতুনভাবে বাঁচিয়ে তোলা, সেই বন্ধনকে সমাজের প্রতি সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধের সঙ্গে মেলানো। উত্তরবঙ্গের দুঃস্থ বোন-বান্ধবদের কথা মনে রেখে, আমাদের উদযাপনের ধরণ একটু বদলে ফেললে — উৎসবে আনন্দ থাকবে, ভালোবাসা থাকবে, এবং সেটি হয়ে উঠবে সবার জন্য এক অবিস্মরণীয় মুহূর্ত।

