মানবতার দীপশিখা : কাওয়াখালির কিশোরদের নিঃস্বার্থ সাহসে জাগছে আশার আলো

নিজস্ব প্রতিবেদন :
একজন অসহায় বিপদে পড়া মানুষকে রক্ষা করা—এটাই পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানব ধর্ম। সকল ধর্মগ্রন্থ ও মনিষীদের বাণীতেও সেই কথাই বারবার উচ্চারিত হয়েছে। গীতা স্বার্থপরতা ত্যাগ করে পরোপকারের পথ দেখায়, বাইবেলে বলা হয়েছে—“ভালোবাসার চেয়ে বড় আদেশ আর নেই”, আর বুদ্ধদেব ঘোষণা করেছিলেন—“করুণা ও মৈত্রীর মধ্যেই মানুষের সত্য পরিচয়”। তবুও বর্তমান সমাজে বারবার দেখা যায়, বিপদে পড়া মানুষের অসহায়তাকে পুঁজি করে কিছু অমানবিক শক্তি লুটে নেয় শেষ সম্বলটুকুও। ক্রমশ ক্ষয় হচ্ছে মানবতা, ভেঙে পড়ছে নৈতিকতার ভিত।

এই বাস্তবতার মাঝেই আশার আলো হয়ে উঠেছে শিলিগুড়ির উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল সংলগ্ন কাওয়াখালির কয়েকজন স্কুলপড়ুয়া কিশোর—কর্ন বর্মন, রাজু মন্ডল ও সুমন দাস। বয়সে তারা এখনও কৈশোর পার করেনি, কিন্তু তাদের চিন্তাভাবনা ও মানবিক বোধ অনেক পরিণত মানুষের কাছেও প্রেরণার উৎস।

সময় পেলে তারা নদীতে গিয়ে সাঁতার কাটে। তবে শুধু আনন্দের জন্য নয়—নদী থেকে প্লাস্টিক ও থার্মোকল কুড়িয়ে কাওয়াখালি নিমতলার ‘সুইট হোম’-এ জমা দেয়। এর বদলে তারা পায় ছোটখাটো উপহার। কিন্তু তাই বলে কি তাদের পুরস্কারের তালিকা শেষ এখানেই? না। তাদের আসল আনন্দ লুকিয়ে রয়েছে অন্য এক মহান কাজে।

কর্ন, রাজু আর সুমন জানায়, নদীতে সাঁতার কাটার সময় যদি কখনও কাউকে ডুবে যেতে দেখে, তারা নিজের জীবন বাজি রেখে তাকে উদ্ধার করতে ছুটে যায়। কোনো পুরস্কারের প্রত্যাশা নেই, নেই বাহবা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা—শুধু একটাই তৃপ্তি, একটি প্রাণ বাঁচানোর অনির্বচনীয় আনন্দ। তাদের ভাষায়, “অসহায় মানুষকে বাঁচাতে পারলে মনে হয় জীবনের সবচেয়ে বড় কিছু করে ফেলেছি।”

দরিদ্র পরিবার, অভাব-অনটনের বাস্তবতা, ঝাঁ-চকচকে ডিগ্রি বা প্রাচুর্য নয়—তবু এই শিশুরাই প্রমাণ করে দিচ্ছে, মানুষকে বড় করে তার মনুষ্যত্ব। বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথায়, “মানুষের ধর্ম মানুষের সেবা”—আর এই কিশোররাই যেন সেই বাণীর জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

আজ যখন সমাজে নৈতিক শিক্ষা ও মূল্যবোধের অভাব নিয়ে আলোচনা চলছে, তখন কাওয়াখালির এই শিশুরা নীরবে দেখিয়ে দিচ্ছে কীভাবে মানবতা গড়ে ওঠে—ভালোবাসা, সাহস ও সহানুভূতির চর্চা থেকেই। নিঃসন্দেহে বলা যায়, এরা শুধু কাওয়াখালির গর্ব নয়, আগামী ভারতের সুনাগরিক হওয়ার পথে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

এই কিশোরদের কাহিনি শুনলে মনে পড়ে যায় মহাত্মা গান্ধীর সেই অমোঘ বাণী—
“তুমি যদি পৃথিবীতে পরিবর্তন দেখতে চাও, তবে সেই পরিবর্তনটা নিজেই হয়ে ওঠো।”
কর্ন, রাজু আর সুমনের হাত ধরে সেই পরিবর্তনের বীজই আজ অঙ্কুরিত হচ্ছে কাওয়াখালির মাটিতে।