নিজস্ব প্রতিবেদন:
৯৪ বছরের চম্পাদেবী আগরওয়ালা— সংগ্রাম, অধ্যবসায় ও মূল্যবোধে ভরপুর এক অনন্য জীবনযাত্রার নাম।
গঙ্গানগর জেলার ডাবরি গ্রামে জন্ম নেওয়া এই রাজস্থানী পর্দানসীন মহিলার জীবনের পথচলা বদলে যায় মাত্র ১৫ বছর বয়সে, যখন তিনি আলিপুরদুয়ার জেলার জলদাপাড়া সংলগ্ন শালকুমারহাটে আসেন।

সেখানেই স্বামী রামকুমার আগরওয়ালার সঙ্গে শুরু হয় নতুন সংসার। প্রথমদিকে ব্যবসায় মিঠুরাম কার্জির সাহায্য পান রামকুমারবাবু। পরবর্তীতে মুদিখানা ও ১৯৫৭ সালে একটি রেশন দোকান খুলে দাঁড় করান জীবিকার পথ।
১৯৭৩ সালে স্বামীর মৃত্যু যেন আছড়ে পড়ে তরুণী চম্পাদেবীর জীবনে।পাঁচ মেয়ে ও দুই ছেলেকে নিয়ে পুরো সংসারের ভার এসে পড়ে তাঁর কাঁধে। তখনকার সমাজে মেয়েদের শিক্ষা ছিল প্রায় নিষিদ্ধের মতো। তবুও স্বামী রামকুমারবাবুর স্বপ্ন—মেয়েদের পড়াশোনা-কে নিজের দৃঢ় সংকল্পে রূপ দেন চম্পাদেবী।
শালকুমারহাট থেকে শিলিগুড়িতে বাড়ি ভাড়া করে সন্তানের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া ছিল এক বিরাট লড়াই। কখনও বাসে, কখনও গরুর গাড়িতে বা রিকশা ভ্যানে দীর্ঘ পথ অতিক্রম—সবটাই মেয়েদের পড়ানোর দৃঢ় বিশ্বাস থেকে।
কখনো অনাহারেও থেকেছেন, কিন্তু তাঁর একটাই কথা—
“মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। তারা উন্নতি না করলে সমাজই এগোতে পারবে না।”শুধু সংসারের দায়িত্ব নয়, শিলিগুড়িতে এসে তিনি অংশীদারিত্বে প্লাস্টিকের জ্যারিকেন তৈরির ব্যবসাও পরিচালনা করেন—অদম্য সংগ্রামের সেই পথকে আরও দৃঢ় করতে।
সময় গড়িয়েছে। আজ তাঁদের সন্তানরা সমাজে প্রতিষ্ঠিত—
জ্যোৎস্না আগরওয়ালা—আইনজীবী, সমাজসেবী, পরিবেশকর্মী। পৌষমেলা থেকে মহানন্দা বাঁচাও আন্দোলন—সবেতেই তার সক্রিয় ভূমিকা।বিদ্যাবতী আগরওয়ালা—শিলিগুড়ি কলেজের অধ্যাপিকা, সমাজসেবায় রাষ্ট্রপতি পুরস্কারপ্রাপ্ত।
দুই পুত্র কেশব ও মহাবীর আগরওয়ালা—প্রাণী সেবা ও সামাজিক কাজে যুক্ত।চম্পাদেবী এখনও নিয়মমাফিক রুটিন মেনে চলেন।ভোর চারটেতে ওঠেন, ‘ব্রহ্ম স্নান’, গীতা পাঠ এবং সংবাদপত্র পড়া—৯৪ বছর বয়সেও তাঁর শৃঙ্খলা অটুট। বর্তমানে শিলিগুড়ির এয়ারভিউ মোড় এলাকায় থাকেন।
শারীরিক অসুবিধার কারণে শালকুমারহাটে যেতে না পারলেও গ্রামের প্রতি তাঁর টান আজও অটুট।অসুস্থতার জন্য কথা বলতে কষ্ট হলেও তিনি একটি বাক্য স্পষ্ট করে বলেন—
“মেয়েদের অবশ্যই পড়াশোনা শেখাতে হবে।”
গরুর গাড়ির যুগ থেকে আজকের ডিজিটাল যুগ—সময় পাল্টেছে, মেয়েরাও এগিয়েছে, শিলিগুড়িও বদলেছে।
কিন্তু চম্পাদেবীর জীবনসংগ্রাম, মূল্যবোধ আর অবিচল অধ্যবসায়—আজও প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে।রাজস্থানী এক পর্দানসীন নারী কীভাবে সমাজের বাধা, কুসংস্কার ও দুঃসময় অতিক্রম করে নিজের পাঁচ কন্যাকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করলেন—চম্পাদেবীর এই গল্প সত্যিই বাংলার নারীশক্তির গৌরবময় উদাহরণ।

