পশ্চিমি ভোগবাদ নয়, ভারতীয় মূল্যবোধই ভবিষ্যতের পথ—দার্জিলিং পাব্লিক স্কুলের সাংস্কৃতিক মঞ্চে জোরালো বার্তা

নিজস্ব প্রতিবেদন:
বর্তমানে চারদিকে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের দাপট চোখে পড়ার মতো। সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার আশায় বহু অভিভাবক ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষাকেই একমাত্র পথ বলে মনে করছেন। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে, সব ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ভারতীয় শিক্ষা-সংস্কৃতি ও পরম্পরার প্রতি সমান গুরুত্ব দেওয়া হয় না।

অনেক ক্ষেত্রে পশ্চিমি ভোগবাদী সংস্কৃতি ও বিদেশি ভাবধারাই হয়ে উঠছে শিক্ষার মূল ভিত্তি। এর ফলস্বরূপ, নতুন প্রজন্ম ধীরে ধীরে ভুলে যাচ্ছে ভারতের সভ্যতা, কৃষ্টি ও মূল্যবোধের শিকড়।

এই প্রেক্ষাপটে সিবিএসই বোর্ডের অধীন দার্জিলিং পাব্লিক স্কুল এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। শিলিগুড়ি সংলগ্ন ফুলবাড়িতে অবস্থিত এই বিদ্যালয়ের বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকেই উঠে আসে ভারতীয় শিক্ষাদর্শনের গুরুত্বের কথা।

বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান ও অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ডঃ আনন্দ গোপাল ঘোষ স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “আজকের দিনে ভারতীয় কৃষ্টি ও সংস্কৃতি আগের চেয়েও বেশি প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে।”

তিনি বলেন, শুধুমাত্র পেশাগত সাফল্য নয়, বরং নৈতিক শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধই একজন মানুষকে প্রকৃত মানুষ করে তোলে। তাঁর কথায় উঠে আসে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই অমর বাণী— “যেখানে মনের ভয় নেই, যেখানে জ্ঞান মুক্ত…”।

এই আদর্শ থেকেই শিক্ষার ভিত তৈরি না হলে ভবিষ্যতে বিদেশি ভাবধারায় পুষ্ট শিক্ষা ব্যবস্থা মানবিক সম্পর্ককে দুর্বল করে দেবে এবং সমাজে বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যাও বাড়তে থাকবে।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন ফুলবাড়ি বৈদিক সেবা আশ্রমের সভাপতি সত্যেন্দ্র আর্য প্রমুখ। সকলেই একবাক্যে মত প্রকাশ করেন যে, ভারতকে বাঁচাতে হলে গীতার শ্রীকৃষ্ণের “কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন”—এই দর্শনে বিশ্বাস রেখে শিক্ষা ব্যবস্থাকে ভারতীয় মূল্যবোধের আলোয় পরিচালিত করতে হবে। আর সেই পথেই এগিয়ে চলেছে দার্জিলিং পাব্লিক স্কুল।

বক্তারা স্মরণ করিয়ে দেন গৌতম বুদ্ধের শিক্ষা— “আপ্প দীপো ভব”, অর্থাৎ নিজেই নিজের আলো হও। পাশাপাশি স্বামী বিবেকানন্দের সেই আহ্বান— “ওঠো, জাগো এবং লক্ষ্য না পাওয়া পর্যন্ত থেমো না”—আজকের ছাত্রছাত্রীদের জন্য কতটা প্রাসঙ্গিক, তাও তুলে ধরা হয়।

এই বিদ্যালয়ের ডিরেক্টর বিজয় কুমার শা-র ভূমিকায় বিশেষভাবে প্রশংসা করেন অতিথিরা। তাঁদের মতে, তাঁর দূরদৃষ্টি ও নেতৃত্বেই স্কুলটি ভারতীয় পরম্পরাভিত্তিক শিক্ষার এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে উঠেছে। বুধবার ফুলবাড়ির এই স্কুলে বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সূচনা হয়, আর বৃহস্পতিবার ছিল তার সমাপ্তি।

দু’দিন ধরে ছাত্রছাত্রীরা নৃত্য, সঙ্গীত, আবৃত্তি, কবিতা ও নাটকের মাধ্যমে দেশাত্মবোধ ও সুস্থ চিন্তাধারার মনোমুগ্ধকর উপস্থাপনা করে। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর “তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব”—এই আদর্শ যেমন মঞ্চে প্রতিফলিত হয়, তেমনই ঝাঁসির রানি লক্ষ্মী বাঈ-এর সাহসিকতার গল্পও ফুটে ওঠে পরিবেশনায়।

দার্জিলিং পাব্লিক স্কুল সারা বছর ধরেই ভারতীয় পরম্পরাকে গুরুত্ব দিয়ে নানান কর্মসূচির আয়োজন করে। খেলাধুলা, পরিবেশ সচেতনতা, পশুপাখির প্রতি সহানুভূতি ও মানবিক বোধ—সব মিলিয়ে এমন শিক্ষা দেওয়া হয় যাতে ছাত্রছাত্রীরা যান্ত্রিক ‘রোবট’-এ পরিণত না হয়।

বাংলার বারো মাসের তেরো পার্বণও এই স্কুলে সমান গুরুত্ব পায়। পয়লা বৈশাখ, দোলযাত্রা, স্বাধীনতা দিবস, প্রজাতন্ত্র দিবস, পৌষ পার্বণ, শারদীয়া দুর্গাপুজো কিংবা দীপাবলি—সব উৎসবই শিক্ষার্থীদের জীবনে সংস্কৃতির রঙ ছড়িয়ে দেয়।

বৃহস্পতিবার স্কুল চত্বরে গণেশ বন্দনা, নৃত্য, আবৃত্তি ও সঙ্গীতের মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীদের প্রতিভা দেখে অভিভাবক ও অতিথিরা মুগ্ধ হন। অনুষ্ঠানের শেষে স্কুল কর্তৃপক্ষের আন্তরিক আতিথেয়তা, বিশেষ করে ডিরেক্টর বিজয় কুমার শা এবং দার্জিলিং পাব্লিক স্কুল পরিবারের এই ব্যতিক্রমী আয়োজনের ভূয়সী প্রশংসা করে সকলে বাড়ি ফেরেন—মনভরে ভারতীয় সংস্কৃতির গর্ব বুকে নিয়ে।