প্রেমের ভিতেই সংগঠনের শক্তি—শিলিগুড়িতে সারদা মায়ের জন্মবার্ষিকীতে ভাবনামূলক বার্তা

নিজস্ব প্রতিবেদক :
আজকের সময়ে অসংখ্য সংগঠন, সংঘ কিংবা দল গড়ে উঠলেও যুগাবতার শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব কখনও প্রচলিত অর্থে ‘দল’ গড়ার পথে হাঁটেননি—এই গভীর ভাবনাই রবিবার তুলে ধরলেন দার্জিলিং শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ আশ্রমের সম্পাদক মহাতপানন্দজী মহারাজ।

তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, পরাধীন ভারতের সময়ে ব্রাহ্ম সমাজের প্রতিনিধিরা ঠাকুরকে বলতেন—“আপনার তো একটু দল করার ক্ষমতা দরকার। যে আসে তাকেই গ্রহণ করেন, এভাবে কি দল হয়?”

এর উত্তরে পরবর্তীকালে স্বামী বিবেকানন্দ ব্যাখ্যা করেছিলেন—ঠাকুরের দল গড়ার নিজস্ব এক বিশেষ পদ্ধতি ছিল, যা বাহ্যিক চোখে ধরা পড়ে না। অবচেতনভাবেই তাঁর সংগঠন গড়ে উঠেছিল।মহারাজের কথায়, কোনও সংগঠন বা সংঘে মতপার্থক্য, কষ্ট কিংবা মনোমালিন্য থাকলেও শুধু কাঠামোর জোরে সংগঠন এগোয় না।

সংগঠন এগোয় পারস্পরিক প্রেম, সহমর্মিতা ও বিশ্বাসের ভিতের উপর। প্রেমের ভিত্তিতে যে সংগঠন গড়ে ওঠে, তা কখনও ভেঙে যায় না।এই মূল্যবান বক্তব্য উঠে আসে শিলিগুড়ি এস এফ রোডের মাহেশ্বরী সেবা সদনে আয়োজিত শ্রীশ্রী সারদা মায়ের ১৭৩তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত সারাদিনব্যাপী ভক্তিমূলক অনুষ্ঠানে।

অনুষ্ঠানে শিলিগুড়ি শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ বেদান্ত আশ্রমের স্বামী রাঘবানন্দ মহারাজ কথায় ও গানে শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ও সারদা মায়ের বন্দনা পরিবেশন করেন।সকালে প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের পর বক্তব্য রাখেন শ্রীশ্রী সারদা সংঘের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদিকা শিপ্রা সহায়। তিনি সারদা মায়ের দর্শন ও বাণী স্মরণ করিয়ে দিয়ে সকলকে সৎ জীবন ও সেবামূলক কাজে উদ্বুদ্ধ করেন।

স্বামী বিবেকানন্দের ভাবনায় নারী জাতির উত্তরণ ও ক্ষমতায়ন প্রসঙ্গে সুগভীর বক্তব্য রাখেন সুতপা শর্মা ব্যানার্জী।
অনুষ্ঠানে বিশেষ আকর্ষণ ছিল মাত্র নয় বছরের শিশু শৌনক ভাদুড়ির অভিনীত শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবকে নিয়ে নাটক, যা দর্শকদের মন জয় করে নেয়। বিশিষ্ট শিল্পী আশীষ ব্যানার্জীর ভক্তিমূলক সঙ্গীত দর্শক-শ্রোতাদের আবেগে ভাসায়।

পাশাপাশি ডালিয়া সরকার ও শ্যামলী তালুকদারের সঙ্গীত পরিবেশনও বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়।
শ্রীশ্রী সারদা সংঘের শিলিগুড়ি টাউন শাখার সদস্যারা সমবেত সঙ্গীত পরিবেশন করেন। আবৃত্তি ও সঞ্চালনায় ছিলেন ঝুমা ভাদুড়ি।অনুষ্ঠানে আরও অনেক শিল্পী তাদের শিল্পী প্রতিভা মেলে ধরেন।

অনুষ্ঠানের শুরুতে বক্তব্য রাখেন শিলিগুড়ি টাউন শাখার সভাপতি নীলিমা দাস চ্যাটার্জী। শেষে সকলকে ধন্যবাদ জানান শাখার সাধারণ সম্পাদিকা সঙ্গীতা নন্দী।
এদিন হাওড়ার রামরাজতলার সম্পাদিকা কৃষ্ণা রায়, কলকাতার বেহালা-বরিশা শাখার সম্পাদিকা চৈতালি দেব সহ জলপাইগুড়ি, কোচবিহার ও আলিপুরদুয়ার শাখার সদস্যা ও সম্পাদিকাদের সংবর্ধনা প্রদান করা হয়।

সব মিলিয়ে সৎ সঙ্গ ও ভক্তির পরিবেশ তৈরিতে শিলিগুড়ি সারদা সংঘের এই উদ্যোগ রবিবার বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়। উল্লেখ্য, এর আগের দিন শনিবার রাতে শিলিগুড়ি বাবুপাড়ায় সারদা সংঘের নবনির্মিত মন্দির গৃহের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদিকা শিপ্রা সহায়।
প্রাসঙ্গিক উদ্ধৃতি
শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব:
“যত মত, তত পথ—সব পথই শেষ পর্যন্ত সেই এক সত্যের দিকেই যায়।”

শ্রীশ্রী সারদা মা:
“একে অপরকে ভালোবাসো, এটাই আমার কাছে বড় সাধনা।”
স্বামী বিবেকানন্দ:
“প্রেমই জীবন, প্রেমই শক্তি—যেখানে প্রেম নেই, সেখানে কোনও মহৎ কাজ স্থায়ী হতে পারে না।