নিজস্ব প্রতিবেদক : মহাকাল মন্দিরের শিলান্যাস অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকেই উত্তরবঙ্গের সামগ্রিক উন্নয়নের লক্ষ্যে একগুচ্ছ গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শিলিগুড়ির মাটিগাড়ায় আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী জানান, রাজ্যের উন্নয়নকে আরও গতিশীল করা এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে সহজ ও স্বচ্ছন্দ করে তুলতেই এই উদ্যোগগুলি নেওয়া হয়েছে।

পরিকাঠামো, পরিবহণ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাক্ষেত্রে একযোগে যে বিনিয়োগের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে, তা উত্তরবঙ্গের উন্নয়নের ক্ষেত্রে এক নতুন দিশা বলে মনে করছেন প্রশাসনিক ও সামাজিক মহল।উত্তরবঙ্গ সফরের প্রথম দিনেই শুক্রবার শিলিগুড়িতে বড়সড় ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। প্রস্তাবিত ‘মহাকাল মহাতীর্থ’ মন্দির প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক শিলান্যাস করেন তিনি।
মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেন, এই মন্দির বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম শিব মন্দির হিসেবে গড়ে উঠতে চলেছে। শিলান্যাসের আগেই মঞ্চ থেকে একাধিক সরকারি প্রকল্পের সূচনা ও ঘোষণা করা হয়।যাত্রী পরিষেবাকে আরও আধুনিক ও আরামদায়ক করতে নর্থ বেঙ্গল স্টেট ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশনের অধীনে ছয়টি নতুন স্লিপার ভলভো বাস চালুর কথা ঘোষণা করা হয়। এই প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১১.৩৬ কোটি টাকা।
শিলিগুড়ি–কলকাতা–দিঘা, আলিপুরদুয়ার–কলকাতা–দিঘা এবং কোচবিহার–কলকাতা–দিঘা রুটে চলাচল করবে এই বাসগুলি। যাত্রীদের সুবিধার্থে প্রতিটি আসনের সঙ্গে থাকবে ব্যক্তিগত টিভি, ওয়াই-ফাই, মোবাইল চার্জিং পয়েন্ট এবং আধুনিক অগ্নি সনাক্তকরণ ও অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থা।পরিবেশবান্ধব পরিবহণ ব্যবস্থার উপর জোর দিয়ে সাউথ বেঙ্গল স্টেট ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশনের জন্য ১৩টি সিএনজি বাস কেনার সিদ্ধান্তও জানানো হয়, যার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৫.২০ কোটি টাকা।
পাশাপাশি ওয়েস্ট বেঙ্গল ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশনের অধীনে কলকাতা রুটে চলাচলের জন্য ১৮টি এসি মিডি বাস চালু করা হবে, এই প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫.৫০ কোটি টাকা।স্বাস্থ্য পরিষেবার ক্ষেত্রেও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগের কথা ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি ও দার্জিলিং জেলায় মোট ১১টি নতুন স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি ‘চা বন্ধু’ স্বাস্থ্যকেন্দ্র প্রকল্পের আওতায় এই তিন জেলাতেই বিনামূল্যে অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবা চালু করা হচ্ছে, যার ফলে চা বাগান ও প্রত্যন্ত এলাকার বাসিন্দাদের জরুরি চিকিৎসা পরিষেবা আরও সহজলভ্য হবে। শিশু সুরক্ষা ও পরিচর্যা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে ১৭টি শিশু যত্নকেন্দ্রেরও উদ্বোধন করা হয়।
শিক্ষাক্ষেত্রেও উন্নয়নের বার্তা শোনা যায়। কালিম্পংয়ের চারখোল এলাকায় একলব্য মডেল রেসিডেনশিয়াল স্কুলের শিলান্যাস করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের জনজাতি উন্নয়ন দপ্তরের অধীনে নির্মিত এই আবাসিক বিদ্যালয়ের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৬.৮১ কোটি টাকা। এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ৮০ হাজার মানুষ উপকৃত হবেন বলে জানানো হয়েছে, বিশেষত জনজাতি অধ্যুষিত এলাকার ছাত্রছাত্রীরা আধুনিক শিক্ষার সুযোগ পাবেন।
মহাকাল মহাতীর্থ প্রকল্পের বিস্তারিত নকশাও তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। ‘মহাকাল মহাতীর্থ’ নামে এই মন্দিরের প্রধান আকর্ষণ হবে শিবের ২১৬ ফুট উচ্চতার বিশাল মূর্তি। একসঙ্গে প্রায় এক লক্ষ দর্শনার্থী এখানে সমবেত হতে পারবেন বলে জানানো হয়েছে। আগামী দুই থেকে আড়াই বছরের মধ্যে মন্দির নির্মাণ সম্পন্ন করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
শিলিগুড়ি শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত প্রয়োজনীয় জমি একটি ট্রাস্টের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে এবং এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে হিডকোকে।মুখ্যমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে জানান, ভাষণ শেষ হওয়ার পরেই পবিত্র শিলান্যাস সম্পন্ন হবে এবং এই মহাতীর্থ উত্তরবঙ্গের আধ্যাত্মিক,
সাংস্কৃতিক ও পর্যটন মানচিত্রে এক নতুন অধ্যায় যোগ করবে। প্রশাসনের আশা, এই সমস্ত প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে উত্তরবঙ্গের যোগাযোগ ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য পরিষেবা, শিক্ষা পরিকাঠামো ও পর্যটন ক্ষেত্র একসঙ্গে নতুন গতি পাবে।

