দূষণে বিপন্ন ফুলবাড়ি জলাভূমি, বিশ্ব জলাভূমি দিবসে বিশেষ সংরক্ষণের দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদন :
ফুলবাড়ি মহানন্দা ব্যারেজ সংলগ্ন জলাভূমির পরিবেশগত ভারসাম্য আজ মারাত্মক চাপে। নদীর জলে বাড়তে থাকা দূষণ, বিশেষ করে প্লাস্টিক ও নানান আবর্জনা ফেলার প্রবণতা, সরাসরি প্রভাব ফেলছে জলজ প্রাণী ও পাখির ওপর। আগে যে মাছেরা পাখির মল খেয়ে খাদ্যচক্রের অংশ ছিল, সেই স্বাভাবিক বাস্তুতন্ত্র এখন ভেঙে পড়ার মুখে। ফলে পরিযায়ী পাখির ঝাঁকও আগের মতো আর নিশ্চিন্তে এখানে নামতে পারছে না।

পরিবেশপ্রেমী সংগঠন ঐরাবত বিশ্ব জলাভূমি দিবস উপলক্ষে ২ ফেব্রুয়ারী ফুলবাড়ি জলাভূমিকে “বিশেষ সংরক্ষিত জলাশয়” হিসেবে ঘোষণা করার দাবি তুলেছে। সংস্থার প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর অভিযান সাহা জানান, সাম্প্রতিক সমীক্ষা অনুযায়ী ফুলবাড়ি জলাশয় অঞ্চলে ২০০-র বেশি প্রজাতির পরিযায়ী পাখি আসে।

এছাড়া এখানে ১৩–১৪ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, প্রায় ৯০ প্রজাতির মাছ, ৬০ ধরনের প্রজাপতি এবং ৩০০-রও বেশি উদ্ভিদ প্রজাতির অস্তিত্ব রয়েছে। মহানন্দা, বালাসন, লচখা ও তিস্তা ক্যানেল মিলেই গড়ে উঠেছে এই গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি অঞ্চল। প্রকৃতি ও পরিবেশের স্বার্থে এমন একটি জীববৈচিত্র্যপূর্ণ স্থানকে দ্রুত সংরক্ষণের আওতায় আনা জরুরি বলেই মত সংগঠনের।

বিশিষ্ট মৎস্য গবেষক ডঃ বিমল চন্দ বলেন, “জলাভূমি হলো প্রকৃতির কিডনি।” বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষায় জলাভূমির ভূমিকা অপরিসীম। এগুলো ধ্বংস হলে তার বিরূপ প্রভাব শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনেও পড়বে। তিনি সতর্ক করে জানান, এখনই ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে ভয়াবহ পরিবেশগত সংকট দেখা দিতে পারে।

বিশ্ব জলাভূমি দিবসকে সামনে রেখে ডঃ বিমল চন্দ, পরিবেশকর্মী অভিযান দে, সিকে ছেত্রীসহ অন্যান্যরা মহানন্দা ব্যারেজ সংলগ্ন এলাকায় গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা, মাছ বিক্রেতা ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলেন। তাঁরা বোঝানোর চেষ্টা করেন, কেন এই জলাভূমি রক্ষা করা সময়ের দাবি।

এদিন স্থানীয় বাসিন্দা মিঠুন রায় উদ্যোগ নিয়ে নদী পরিষ্কার অভিযানে নামেন এবং সেখান থেকে প্রায় ৯০ বস্তা প্লাস্টিক উদ্ধার করেন। পরে সেগুলি বন দপ্তরের হাতে তুলে দেওয়া হয়। তবুও সমস্যা কমছে না। শিলিগুড়ি শহর ও আশপাশের বহু মানুষ এখনও নদীতে প্লাস্টিক ও আবর্জনা ফেলছেন।

সেগুলো ভেসে এসে জমছে ফুলবাড়ি জলাভূমিতে, যার ফলে জলাশয়ের গভীরতা কমছে এবং মাছসহ নানা জলজ প্রাণীর অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়ছে।পরিবেশবিদদের মতে, বহু মাছের প্রজাতি ইতিমধ্যেই হারিয়ে গেছে, অনেকের প্রজনন ক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে মাছের সংখ্যা দ্রুত কমছে।

এই পরিস্থিতিতে ডঃ বিমল চন্দ জলাভূমি সংলগ্ন এলাকায় বৈজ্ঞানিকভাবে মাছ চাষের ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন, যাতে পরিবেশ রক্ষা ও জীবিকায় ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব হয়।সব মিলিয়ে, ফুলবাড়ি জলাভূমি এখন সংরক্ষণ না করলে ভবিষ্যতে এই অঞ্চলের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে বলেই আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।