ক্যান্সারকেও হার মানিয়েছে সুর— শিলিগুড়ির তপতী রায়ের অনন্য সঙ্গীতযাত্রা

নিজস্ব প্রতিবেদক :
জীবনের কঠিনতম লড়াইয়ের মাঝেও যার সঙ্গ ছাড়েনি সুর, তিনি তপতী রায়। শিলিগুড়িতে জন্ম ও বেড়ে ওঠা এই শিল্পী আজ পন্ডিচেরীর শ্রী অরবিন্দ আশ্রমের বাসিন্দা। আশ্রম পরিচালিত সঙ্গীত শিক্ষাকেন্দ্রে তিনি একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষিকা। তাঁর দিনযাপন, ভাবনা, ধ্যান—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সঙ্গীত।

সম্প্রতি বিশ্ব ক্যান্সার সচেতনতা দিবস উপলক্ষে শিলিগুড়িতে এসে ৬৯ বছর বয়সী এই ক্যান্সার জয়ী শিল্পী ভাগ করে নিলেন তাঁর জীবনের সংগ্রাম আর সঙ্গীতসাধনার গল্প। কয়েক বছর আগেই তিনি মারণব্যাধি ক্যান্সারের সঙ্গে কঠিন লড়াই লড়েছেন। কিন্তু অসুস্থতার ভয়াবহ যন্ত্রণা তাঁর কণ্ঠরোধ করতে পারেনি। বরং হাসপাতালে সিসিইউ-তে ভর্তি থাকাকালীনও

তাঁকে গুনগুন করে গান গাইতে দেখা গেছে— যা চিকিৎসকদেরও বিস্মিত করেছিল।তপতীদেবীর সঙ্গীতজীবনের সূচনা শৈশবেই। মাত্র তিন বছর বয়সে শিলিগুড়ির হাকিমপাড়ায় প্রয়াত পিতা ক্ষিতীশ চন্দ্র বিশ্বাসের হাত ধরে তাঁর সুরের পথে যাত্রা শুরু। ধীরে ধীরে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের গভীর সাধনায় নিজেকে যুক্ত করেন তিনি।

দীর্ঘ জীবনে বহু বিশিষ্ট গুরু ও শিল্পীর সান্নিধ্য পেয়েছেন, আর সেই শিক্ষার ধারাই আজও বহমান।তাঁর কথায়, “সঙ্গীতই আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। শরীর ভেঙে গেলেও মন ভাঙতে দেয়নি সুর। যতদিন আছি, ততদিন গান নিয়েই থাকতে চাই।”শ্রী অরবিন্দ ও শ্রী মায়ের আদর্শে অনুপ্রাণিত তপতীদেবী জানালেন, উত্তরবঙ্গের পাহাড় তাঁকে আজও টানে। বর্তমানে পন্ডিচেরীতে থাকলেও সুযোগ পেলেই শিলিগুড়িতে ফিরে আসেন।

এবারের সফরেও সিকিমের পেলিং-সহ পাহাড়ি অঞ্চলে ঘুরে নতুন উদ্যমে নিজেকে ভরিয়ে নিয়েছেন। খুব শিগগিরই তিনি আবার পন্ডিচেরীর আশ্রমে ফিরে গিয়ে সঙ্গীতচর্চা ও শিক্ষাদানের কাজে মন দেবেন।তাঁর স্বামী অশোক রায়, যিনি শ্রী অরবিন্দ অনুরাগী লেখক ও চিন্তাবিদ হিসেবে পরিচিত, বলেন, “ক্যান্সারের মতো কঠিন রোগের সঙ্গেও লড়াই করতে সঙ্গীত যে কত বড় শক্তি হতে পারে, তপতী তার জীবন্ত প্রমাণ।” সবসময় স্ত্রীর সঙ্গীতসাধনায় তিনি উৎসাহ জুগিয়ে এসেছেন।

সঙ্গীত বিশারদদের মতে, সঙ্গীত শুধু বিনোদন নয়—এটি এক গভীর মানসিক ও আধ্যাত্মিক সাধনা। সুর ও তাল মানুষের মস্তিষ্কে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে, উদ্বেগ কমায়, ব্যথা সহ্য করার ক্ষমতা বাড়ায়। ক্যান্সারের মতো দীর্ঘ চিকিৎসার সময় সঙ্গীত মানসিক শক্তি জোগাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।
তপতী রায়ের জীবন তাই কেবল একজন শিল্পীর গল্প নয়—এটি আশা, সাহস এবং সুরের নিরাময় ক্ষমতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর কণ্ঠে যেমন সুর বেজে ওঠে, তেমনই তাঁর জীবনও যেন এক অমলিন রাগিণী—যা হার মানাতে জানে না কখনও।