দেশ–বিদেশের ভক্তির মিলনমেলা শিলিগুড়ি ইসকনে—কীর্তনে আধ্যাত্মিকতা, বিজ্ঞান ও মানবিক বন্ধনের অনন্য সুর

নিজস্ব প্রতিবেদন :
শুক্রবার ৬ ফেব্রুয়ারী থেকে শিলিগুড়ি ইসকনে শুরু হয়েছে কীর্তন মেলা। বিদেশি ইসকন ভক্তরাও সেই কীর্তন মেলায় সামিল হয়েছেন।বিদেশি ইসকন ভক্তদের শিলিগুড়িতে এসে কীর্তন মেলায় যোগ দেওয়া শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় আয়োজন নয়—এর মধ্যে লুকিয়ে আছে গভীর সামাজিক, আধ্যাত্মিক ও বৈজ্ঞানিক তাৎপর্য। ভক্তি, সংস্কৃতি ও চেতনার এক অনন্য মিলনক্ষেত্রে এখন পরিণত হয়েছে শিলিগুড়ি ইসকন মন্দির।

৬ ফেব্রুয়ারি থেকে শিলিগুড়ি ইসকনের হলঘরে শুরু হয়েছে এই কীর্তন মেলা, যা চলবে ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে মন্দির বন্ধ হওয়া পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে চলছে হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্রের কীর্তন। তিন দিনের এই মহোৎসবে দেশ–বিদেশের অসংখ্য ভক্তের উপস্থিতিতে ইসকন প্রাঙ্গণ যেন এক বিশ্বভক্তির মঞ্চে রূপ নিয়েছে।

বিদেশি ভক্তদের পাশাপাশি বৃন্দাবন, নবদ্বীপ ও মায়াপুর থেকে বহু ইসকন ভক্ত শিলিগুড়িতে এসেছেন এই কীর্তন মেলায় যোগ দিতে। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেও কৃষ্ণভক্তদের ঢল নেমেছে। ভাষা, দেশ, সংস্কৃতির পার্থক্য থাকলেও হরিনামের সুরে সব ভেদাভেদ মিলিয়ে গিয়ে তৈরি হয়েছে এক গভীর আধ্যাত্মিক ঐক্য।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণ শিলিগুড়ি ও উত্তরবঙ্গকে আন্তর্জাতিক আধ্যাত্মিক মানচিত্রে আরও দৃঢ়ভাবে তুলে ধরছে। ধর্মীয় পর্যটনের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক সৌহার্দ্যও এতে নতুন মাত্রা পাচ্ছে। স্থানীয় ভক্তদের মধ্যেও এই দৃশ্য এক গভীর অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করেছে—বিদেশিরা নিষ্ঠার সঙ্গে মহামন্ত্র জপ করছেন দেখে অনেকেই নতুন করে ভক্তির পথে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন।

আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে কীর্তন হল ঈশ্বরের নাম শ্রবণ ও কণ্ঠের মাধ্যমে স্মরণ করার সহজতম পথ। কলিযুগে হরিনাম সংকীর্তনকেই বলা হয় সর্বশ্রেষ্ঠ সাধনা। কীর্তনের মাধ্যমে মন ধীরে ধীরে অহংকার, ভয় ও দুঃখ থেকে মুক্ত হয়—ভক্তি তখন আর শুধু বিশ্বাসে সীমাবদ্ধ থাকে না, তা হয়ে ওঠে হৃদয়ের অনুভব।

এক্ষেত্রে বিজ্ঞানও কীর্তনের পক্ষে কথা বলছে। গবেষণায় দেখা গেছে, সমবেত কীর্তন ও মন্ত্রজপ মানসিক চাপ কমায়, স্ট্রেস হরমোন কর্টিসলের মাত্রা হ্রাস করে এবং স্নায়ুকে শান্ত রাখে। কীর্তনের সময় মস্তিষ্কে আলফা ও থিটা ব্রেন ওয়েভ সক্রিয় হয়, যা গভীর ধ্যানের মতোই কাজ করে। একই ছন্দে গান গাওয়া বা শোনার ফলে শ্বাস-প্রশ্বাস ও হৃদস্পন্দন নিয়ন্ত্রিত হয়, মানসিক ভারসাম্য বজায় থাকে।

একসঙ্গে বহু মানুষের কীর্তনে যে শব্দ-কম্পন তৈরি হয়, বিজ্ঞান তাকে বলে ‘এনট্রেইনমেন্ট ইফেক্ট’—এই সমবেত শক্তি মানুষে মানুষে এক অদৃশ্য বন্ধন গড়ে তোলে। আধুনিক জীবনের একাকীত্ব, মানসিক চাপ ও শূন্যতা থেকে মুক্তির পথ হিসেবেই অনেক বিদেশি ভক্ত কীর্তনের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের কাছে কীর্তন কোনো ধর্মীয় জোর নয়, বরং এক গভীর inner healing process।

সব মিলিয়ে শিলিগুড়ি ইসকনের এই কীর্তন মেলা প্রমাণ করছে—
কীর্তন শুধু গান নয়,
এটি আত্মার ভাষা,
মনের ওষুধ,
আর বিশ্বমানবতার এক অনন্য বন্ধন।

তিন দিনের এই কীর্তন উৎসব শিলিগুড়িকে শুধু ভক্তির শহর নয়, বরং আন্তর্জাতিক আধ্যাত্মিক মিলনমেলার এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে নতুন পরিচিতি দিচ্ছে।