নিজস্ব প্রতিবেদন :
“পুরাতন সেই দিনের কথা, ভুলবি কি রে হায়…”
সময়ের স্রোতে হারিয়ে যাওয়া অনেক কিছুর মতোই, মাটির উনুনও যেন আজ আবার ফিরে আসতে চাইছে নতুন করে।“যখন তোমার পাশে কেউ ছিল না, তখন ছিলাম আমি…
আজ তোমার ঘরে সব আছে, তবু আমি পর হয়ে গেছি!”

অবহেলা, বিস্মৃতি আর প্রয়োজনের দ্বন্দ্ব—এই তিনের মাঝেই নিজের গল্প শোনাচ্ছে একসময়কার অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী, মাটির উনুন!!প্রায় তিন দশক আগেও শহর হোক বা গ্রাম—প্রতিটি বাড়ির রান্নাঘরে মাটির উনুন ছিল নিত্যসঙ্গী। ঘুঁটে, কাঠ কিংবা কয়লার আগুনে রান্না হতো প্রতিদিনের খাবার।
সেই আগুনে জ্বলত শুধু চুলা নয়, গৃহস্থ জীবনের ছন্দও।
পরিবর্তনের হাওয়া বয়ে আসে প্রযুক্তির হাত ধরে। এলপিজি গ্যাসের সহজলভ্যতা ও আধুনিকতার প্রভাবে ধীরে ধীরে মাটির উনুন হারাতে থাকে তার জায়গা। একসময় শহরাঞ্চলেও গোবরের ঘুঁটে তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন বহু মানুষ—আজ সেই চিত্র প্রায় বিলুপ্ত।
ধোঁয়া ও দূষণের যুক্তিতে মানুষ মুখ ফিরিয়েছে পুরনো পদ্ধতি থেকে। কিন্তু আন্তর্জাতিক অস্থিরতা, বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব, তৈরি করেছে গ্যাসের ঘাটতি। আর সেই সঙ্কটই যেন নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে মাটির উনুনের প্রাসঙ্গিকতা।
শিলিগুড়ির বর্ধমান রোডে বছরের পর বছর ধরে একদল মহিলা প্রতিকূল আবহাওয়া উপেক্ষা করে মাটির উনুন ও ঘুঁটে বিক্রি করে চলেছেন। ছট পুজো ছাড়া বছরের অধিকাংশ সময়ই তাদের বিক্রি ছিল অত্যন্ত কম। তবে সাম্প্রতিক গ্যাস সঙ্কটে কিছুটা হলেও বেড়েছে চাহিদা, পাশাপাশি দামও।
যদিও এই চাহিদা মূলত চায়ের দোকান ও ছোট হোটেলগুলির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সাধারণ মানুষের ঘরে এখনও তেমনভাবে জায়গা করে নিতে পারেনি এই ঐতিহ্যবাহী উনুন।
এদিকে, আধুনিকতার অজুহাতে তাদের ব্যবসা গুটিয়ে দেওয়ার অভিযোগ তুলছেন বিক্রেতারা।
বর্ধমান রোড থেকে তাদের সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও উঠে আসছে। পাশের ঝকঝকে শপিং মলে যাতায়াতকারীদের অনেকেই ঘুঁটের গন্ধে বিরক্ত হয়ে নাক সিটকান—যেন এই জীবিকা আজ অপ্রাসঙ্গিক।
কিন্তু বাস্তবতা যেন অন্য গল্প বলছে। গ্যাসের অভাবে যখন অনেক হোটেল-রেস্তোরাঁ বন্ধ হওয়ার মুখে, তখন এই মাটির উনুন ও ঘুঁটেই হয়ে উঠছে শেষ ভরসা। ফলে নতুন করে এর গুরুত্ব উপলব্ধি করছেন ব্যবসায়ীরা।
এদিকে বর্ধমান রোডে উড়ালপুল নির্মাণকে কেন্দ্র করে উনুন ও ঘুঁটের বাজার তুলে দেওয়ার দাবি উঠেছে। এতে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন এই মহিলারা। তারা চাইছেন পুনর্বাসন—একটু স্থায়ী জায়গা, যেখানে বাঁচিয়ে রাখা যাবে তাদের বহুদিনের জীবিকা।
শেষমেশ যেন প্রবাদটাই আবার সত্যি হয়ে উঠছে—
“ঘুঁটে পোড়ে, গোবর হাসে”—
যাকে এতদিন অবহেলা করা হয়েছে, প্রয়োজনের সময় তাকেই আবার আঁকড়ে ধরতে হচ্ছে।
গ্যাস সঙ্কট যেন নতুন করে মনে করিয়ে দিল—
মাটির উনুন শুধু অতীতের স্মৃতি নয়, সংকটের দিনে আজও এক অনিবার্য বাস্তব।

