শিল্প-বাণিজ্য থেকে স্বাস্থ্য ও পর্যটন— মুখ্যমন্ত্রীর হাতে ১৪ দফা উন্নয়ন প্রস্তাব, আশ্বাস প্রশাসনের

নিজস্ব প্রতিবেদন : পশ্চিমবঙ্গের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন, উত্তরবঙ্গের শিল্প-বাণিজ্য প্রসার, পর্যটন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অবকাঠামো উন্নয়নের দাবিতে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর হাতে একটি বিস্তারিত স্মারকলিপি তুলে দিল ইস্টার্ন ইন্ডিয়া চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ। ২০ মে বুধবার শিলিগুড়িতে মুখ্যমন্ত্রীর হাতে এই চিঠি প্রদান করা হয়।

সংস্থার তরফে সম্পাদক গৌরিশঙ্কর গোয়েল খবরের ঘন্টাকে জানিয়েছেন, মুখ্যমন্ত্রী তাঁদের দাবিগুলি গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন।

চিঠিতে প্রথমেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে ঐতিহাসিক নির্বাচনী জয়ের জন্য অভিনন্দন জানানো হয়। সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এই জয় বাংলার মানুষের আস্থা, বিশ্বাস ও নেতৃত্বের প্রতিফলন। একইসঙ্গে রাজ্যের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের জন্য মুখ্যমন্ত্রীর সফল নেতৃত্ব কামনা করা হয়।

এরপর রাজ্যের সার্বিক অর্থনৈতিক বিকাশের লক্ষ্যে ১৪ দফা গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব তুলে ধরা হয়।

সংগঠনের দাবি, রাজ্যে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক করিডোর গড়ে তোলা হলে পণ্য ও পরিষেবা পরিবহণ সহজ হবে এবং শিল্প-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে। পাশাপাশি স্থানীয় পরিকাঠামো উন্নয়ন, বিশেষ করে রাস্তা, লজিস্টিক হাব, গুদাম ও যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণের উপর জোর দেওয়া হয়।

ব্যবসা সহজীকরণের ক্ষেত্রেও একাধিক সুপারিশ করা হয়েছে। ট্রেড লাইসেন্স, ব্যবসায়িক নথিপত্র ও অনুমোদনের ক্ষেত্রে সিঙ্গেল-উইন্ডো ব্যবস্থা আরও কার্যকর করার আবেদন জানানো হয়েছে। ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প (MSME)-এর জন্য বিশেষ আর্থিক প্যাকেজ, ঋণ সুবিধা ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচিরও দাবি তোলা হয়েছে।

চিঠিতে শিল্প বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য বিনিয়োগবান্ধব নীতি গ্রহণের উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। পাশাপাশি দার্জিলিং ও ডুয়ার্সের চা শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করা, কৃষি হাব গড়ে তোলা এবং কৃষিপণ্যের বিপণন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার প্রস্তাবও রাখা হয়েছে।

পর্যটন শিল্পের ক্ষেত্রে “সিন্ডিকেট রাজ” ও অস্বচ্ছ প্রথা বন্ধ করার দাবি জানানো হয়েছে। সংগঠনের মতে, স্বচ্ছ ও পর্যটক-বান্ধব পরিবেশ গড়ে তুললে রাজ্যের পর্যটন শিল্প আরও বিকশিত হবে। একইসঙ্গে হোটেল ও আতিথেয়তা শিল্পের জন্য বিশেষ নীতিগত সহায়তা, সহজ লাইসেন্সিং ব্যবস্থা এবং উৎসাহমূলক পদক্ষেপেরও আবেদন করা হয়েছে।

সরকারি স্কুল, কলেজ ও হাসপাতালের আধুনিকীকরণের দাবিও চিঠিতে গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরা হয়েছে। উন্নত চিকিৎসা সরঞ্জাম, পর্যাপ্ত ওষুধ, পরিচ্ছন্নতা এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের উপর জোর দেওয়া হয়।

বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে সরকারি হাসপাতালে পোস্টমর্টেম সংক্রান্ত অতিরিক্ত খরচ ও মৃতদেহ পরিবহণের সমস্যার কথা। সংগঠনের অভিযোগ, বহু পরিবার এই কারণে চরম আর্থিক ও মানসিক দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে। বিষয়টি দ্রুত সমাধানের জন্য মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়েছে।

চিঠিতে সমাজবিরোধী, রাজনৈতিক দুষ্কৃতী ও দুর্নীতিগ্রস্ত আধিকারিকদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের দাবিও জানানো হয়েছে। পাশাপাশি বেআইনি দোকান ও লাইসেন্সবিহীন ব্যবসা বন্ধে প্রশাসনিক অভিযান চালানোর আবেদন করা হয়েছে।

উত্তরবঙ্গের বাণিজ্যিক উন্নয়নের স্বার্থে গুলমাকে সিকিম ও পাহাড়ি এলাকার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সংগঠনের মতে, সেখানে পর্যাপ্ত জমি ও ভৌগোলিক সুবিধা রয়েছে, যা ভবিষ্যতে বড় বাণিজ্যকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।

এছাড়াও উত্তরবঙ্গে শিল্প স্থাপনে জিএসটি বৈষম্যের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেশী অসম ও সিকিমে কেন্দ্রীয় কর ছাড়ের সুবিধা থাকায় উত্তরবঙ্গ শিল্প বিনিয়োগে পিছিয়ে পড়ছে বলে দাবি করা হয়েছে। এই বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে বিশেষ আর্থিক সুবিধা আনার আবেদন জানানো হয়েছে।

সবশেষে সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রাজ্যের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে তারা সরকারের পাশে থেকে পূর্ণ সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।