শিশু-কিশোরদের চোখে বাড়ছে মায়োপিয়া, মোবাইলের জগৎ থেকে প্রকৃতির কোলে ফিরলেই মিলতে পারে মুক্তির পথ

নিজস্ব প্রতিবেদন :
বর্তমান সময়ে শিশু ও কিশোরদের মধ্যে দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে চোখের এক গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা— মায়োপিয়া বা মাইনাস পাওয়ার। একসময় তুলনামূলক কম দেখা গেলেও এখন অল্প বয়সেই বহু ছাত্রছাত্রীকে চশমা ব্যবহার করতে হচ্ছে। চিকিৎসকদের মতে, অতিরিক্ত মোবাইল ও স্ক্রিন নির্ভরতা, দীর্ঘক্ষণ কাছের জিনিসের দিকে তাকিয়ে থাকা এবং প্রকৃতি ও খেলাধুলা থেকে দূরে সরে যাওয়াই এই সমস্যার বড় কারণ।

এই বিষয়ে সচেতনতা গড়ে তুলতে রবিবার শিলিগুড়ি তথ্যকেন্দ্রের রামকিঙ্কর হলে একটি বিশেষ সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে শিলিগুড়ির বর্ধমান রোডস্থিত “দ্য হিমালয়ান আই ইন্সটিটিউট”। শিশুদের মধ্যে মায়োপিয়া প্রতিরোধ এবং চোখের সুরক্ষা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি।

অনুষ্ঠানে স্কুল পড়ুয়াদের জন্য মায়োপিয়া বিষয়ক প্রবন্ধ ও অঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। পাশাপাশি সমাজের বিভিন্ন স্তরের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হয় এক আলোচনা সভা। সভাটি সঞ্চালনা করেন দ্য হিমালয়ান আই ইন্সটিটিউটের দুই বিশিষ্ট চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডাঃ সুপ্রতীক ব্যানার্জী ও ডাঃ স্বরূপ রায়। বিভিন্ন প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে তাঁরা মায়োপিয়ার কারণ, প্রতিরোধ এবং শিশুদের জীবনযাত্রার পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।

আলোচনায় অংশ নেন বিশিষ্ট ক্রিকেট প্রশিক্ষক জয়ন্ত ভৌমিক, ন্যাফের প্রতিষ্ঠাতা অনিমেষ বোস, আন্তর্জাতিক ক্রীড়াবিদ সোমা দত্ত, মনঃস্তত্ত্ববিদ সর্বাণী রায় এবং সমাজসেবী ও সমাজতত্ত্ব বিশারদ তরুণ কুমার মাইতি। তাঁদের বক্তব্যে উঠে আসে আধুনিক জীবনের পরিবর্তিত অভ্যাস কীভাবে শিশুদের চোখের ক্ষতি করছে এবং তার থেকে বেরিয়ে আসার উপায়।

বক্তারা বলেন, এখনকার ছেলেমেয়েরা অধিকাংশ সময় মোবাইল, ট্যাব বা বইয়ের খুব কাছাকাছি থেকে সময় কাটায়। ফলে চোখের স্বাভাবিক দূরে তাকানোর অভ্যাস কমে যাচ্ছে। তাই শিশুদের শুধু পড়াশোনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না রেখে দূরের জিনিস দেখার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। খোলা আকাশ, সবুজ প্রকৃতি, মাঠ কিংবা গাছপালার দিকে তাকানো চোখের জন্য অত্যন্ত উপকারী।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃতির সংস্পর্শে থাকলে চোখের পেশি স্বাভাবিকভাবে কাজ করার সুযোগ পায়। মাঠে খেলাধুলা, দৌড়ঝাঁপ, ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন বা ভলিবলের মতো আউটডোর গেমস শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের পাশাপাশি চোখের স্বাস্থ্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।

চিকিৎসকদের বক্তব্য, একনাগাড়ে কাছের দিকে তাকিয়ে থাকার ফলে চোখের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে “নিয়ার ওয়ার্ক স্ট্রেস” বলা হয়। অন্যদিকে বাইরে প্রাকৃতিক আলোতে সময় কাটালে শরীরে ডোপামিনের নিঃসরণ বাড়ে, যা চোখকে অতিরিক্ত লম্বা হয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। ফলে মায়োপিয়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমে।

আলোচনায় “20-20-20” নিয়মের কথাও উল্লেখ করা হয়। অর্থাৎ প্রতি ২০ মিনিট অন্তর অন্তত ২০ সেকেন্ডের জন্য ২০ ফুট দূরের দিকে তাকানো চোখের জন্য উপকারী।

অভিভাবকদের উদ্দেশে বিশেষজ্ঞরা বলেন, শিশুদের মোবাইল ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে, নিয়মিত বাইরে খেলতে পাঠাতে হবে এবং পর্যাপ্ত আলোতে পড়াশোনা করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি নির্দিষ্ট সময় অন্তর চোখ পরীক্ষা করানোও অত্যন্ত জরুরি।

সভায় বক্তারা একসুরে জানান, প্রযুক্তি জীবনের প্রয়োজন হলেও তার অতিরিক্ত ব্যবহার শিশুদের ভবিষ্যতের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। তাই আগামী প্রজন্মকে সুস্থ রাখতে হলে তাদের আবার ফিরিয়ে আনতে হবে মাঠে, প্রকৃতির মাঝে এবং খোলা আকাশের নিচে। কারণ আধুনিক বিজ্ঞানও আজ বলছে— মায়োপিয়া প্রতিরোধে প্রকৃতিই হতে পারে সবচেয়ে বড় সহায়ক।