তিরোধান দিবসে শ্রদ্ধার্ঘ্য: লোকনাথ ব্রহ্মচারীর জীবন, বাণী ও আদর্শ আজও প্রাসঙ্গিক

নিজস্ব প্রতিবেদন : বুধবার ৩ জুন মহান যোগীপুরুষ, সাধক ও মানবপ্রেমের প্রতীক লোকনাথ ব্রহ্মচারীর তিরোধান দিবস। বাংলার ঘরে ঘরে পূজিত এই মহাসাধক তাঁর আধ্যাত্মিক শক্তি, মানবসেবা ও সহজ-সরল জীবনাদর্শের জন্য আজও কোটি মানুষের হৃদয়ে অম্লান হয়ে আছেন। এই বিশেষ দিনে ভক্তরা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে তাঁকে স্মরণ করছেন।

লোকনাথ ব্রহ্মচারীর জন্ম ১৭৩০ খ্রিস্টাব্দের ৩১ আগস্ট (বাংলা ১৮ ভাদ্র, ১১৩৭ বঙ্গাব্দ) তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার কচুয়া গ্রামে। তাঁর পিতার নাম ছিল রামকানাই ঘোষাল এবং মাতার নাম কমলাদেবী। শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে ধর্মভাব ও আধ্যাত্মিকতার প্রতি গভীর আকর্ষণ দেখা যায়।

অল্প বয়সেই তিনি গৃহত্যাগ করে গুরু ভগবান গাঙ্গুলি-র সান্নিধ্যে প্রবেশ করেন। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে কঠোর তপস্যা, যোগসাধনা ও আত্মনিয়োগের মাধ্যমে তিনি অসাধারণ আধ্যাত্মিক শক্তির অধিকারী হন। ভারত, নেপাল, তিব্বত ও হিমালয়ের বিভিন্ন অঞ্চলে তিনি সাধনা করেছেন বলে ভক্তমহলে প্রচলিত রয়েছে।

পরবর্তীকালে তিনি বর্তমান বাংলাদেশের বরাদি আশ্রমে অবস্থান করেন এবং সেখান থেকেই অসংখ্য মানুষকে ধর্ম, নীতি ও মানবতার শিক্ষা দেন।১৮৯০ খ্রিস্টাব্দের ১৯ জ্যৈষ্ঠ (ইংরেজি ৩ জুন) তিনি বারদী আশ্রমে মহাসমাধি লাভ করেন।

মৃত্যুর আগে তিনি ভক্তদের আশ্বস্ত করে বলেছিলেন যে, তাঁর শরীর না থাকলেও তিনি ভক্তদের পাশে থাকবেন। সেই কারণেই আজও তাঁর ভক্তরা বিশ্বাস করেন, বিপদের সময় বাবা লোকনাথ তাঁদের রক্ষা করেন।

লোকনাথ ব্রহ্মচারীর বহু বাণী আজও মানুষের জীবনে অনুপ্রেরণা জোগায়। তাঁর অন্যতম জনপ্রিয় বাণী “রণে, বনে, জলে, জঙ্গলে যখনই বিপদে পড়িবে, আমাকে স্মরণ করিও; আমিই তোমাকে রক্ষা করিব।”এছাড়াও তিনি বলতেন— “সকল প্রাণীর মধ্যে ঈশ্বরকে দেখো।” “সত্য, প্রেম ও সেবাই মানুষের শ্রেষ্ঠ ধর্ম।”

ভক্তদের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে যে, বাবা লোকনাথ অসংখ্য অলৌকিক ঘটনার মাধ্যমে মানুষের দুঃখ-কষ্ট দূর করেছেন। বহু রোগী তাঁর আশীর্বাদে সুস্থ হয়েছেন বলে ভক্তদের বিশ্বাস। তবে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা অলৌকিকতা নয়, বরং মানবপ্রেম, সহানুভূতি এবং আত্মসংযম।

বর্তমান সময়ে যখন সমাজে হিংসা, বিভাজন ও আত্মকেন্দ্রিকতা বাড়ছে, তখন লোকনাথ ব্রহ্মচারীর আদর্শ আমাদের নতুন পথ দেখায়। তিনি শিখিয়েছেন—
মানুষের সেবা করাই ঈশ্বরসেবা।
সত্য ও সততার পথে চলতে হবে।

সকল ধর্ম ও মানুষের প্রতি সমান শ্রদ্ধা রাখতে হবে।
বিপদের সময় ধৈর্য ও বিশ্বাস হারানো যাবে না।
আত্মসংযম ও নৈতিক মূল্যবোধ জীবনের প্রকৃত সম্পদ।

তিরোধান দিবসে বাবা লোকনাথকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন সাধককে প্রণাম জানানো নয়, তাঁর দেখানো মানবতা, প্রেম ও সেবার পথকে জীবনে ধারণ করার অঙ্গীকার করা। তাঁর আদর্শ যুগে যুগে মানুষকে আলোর পথ দেখিয়েছে এবং আগামী দিনেও দেখাবে।

“জয় বাবা লোকনাথ”—এই ধ্বনি আজও অসংখ্য ভক্তের মনে ভরসা, শান্তি ও আশ্রয়ের প্রতীক হয়ে রয়েছে।