প্রতিবেদকঃ বাপি ঘোষ : “মেজর সাহেব, আমাকে সুস্থ করে দিন, পাকিস্তানকে আমি একাই দেখে নেবো!”
কার্গিল যুদ্ধক্ষেত্রে বুকে গুলি নিয়ে লড়াই করা এক ভারতীয় সেনা জওয়ানের এই কথাই আজও কানে বাজে প্রাক্তন সেনা চিকিৎসক ডাঃ রঞ্জন পালচৌধুরীর। যুদ্ধক্ষেত্রের সেই রোমাঞ্চকর ও আবেগঘন স্মৃতি শুনলে গর্বে ভরে উঠবে প্রতিটি ভারতীয়ের মন।

কার্গিল যুদ্ধ, ১৯৯৯। পাকিস্তানের গুলিতে বুকে গুরুতর আহত এক শিখ রেজিমেন্টের জওয়ান জয় হিন্দ ধ্বনি দিতে দিতে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। সেই সময় ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর ও শল্য চিকিৎসক ডাঃ রঞ্জন পালচৌধুরী তাঁর শরীর থেকে গুলি বের করে জীবন বাঁচান।
সেনা জওয়ানটি সুস্থ হয়ে ওঠেন, যদিও আর যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরতে পারেননি। কার্গিলের সেই স্মৃতি আজও বহন করে চলেছেন ডাঃ পালচৌধুরী। ভারতীয় সেনাবাহিনীতে দীর্ঘদিন সেবা দেওয়ার পর বর্তমানে শিলিগুড়ির আনন্দলোক নার্সিং হোম, শান্তি নার্সিং হোম ও নর্থ বেঙ্গল নিউরোসায়েন্স সেন্টারে রোগীদের চিকিৎসা করছেন তিনি।
প্রতিদিন জিম ও যোগাসনের মাধ্যমে নিজেকে সুস্থ রাখেন এই চিকিৎসক। তাঁর কথায়, “নিজে সুস্থ থাকলেই আরও বেশি শক্তি নিয়ে রোগীদের সেবা করতে পারবো।”
“মেজর সাহেব, আপনি আমাকে সুস্থ করে দিন, পাকিস্তানকে আমি একাই দেখে নেবো।”
১৯৯৯ সালের কার্গিল যুদ্ধের সময় বুকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় থাকা এক শিখ রেজিমেন্টের ভারতীয় সেনা জওয়ান ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর ও শল্য চিকিৎসক ডাঃ রঞ্জন পালচৌধুরীকে এই কথাই বলেছিলেন। গুরুতর আহত হয়েও তিনি “জয় হিন্দ” ধ্বনি দিতে দিতে দেশের জন্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রুত অস্ত্রোপচার করে ওই জওয়ানের শরীর থেকে গুলি বের করেন ডাঃ রঞ্জন পালচৌধুরী। চিকিৎসার ফলে তিনি প্রাণে বেঁচে যান এবং সুস্থ হয়ে ওঠেন। যদিও পরবর্তীতে আর যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরে যাওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি।
কার্গিলের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের সেই ভয়ঙ্কর দিনগুলোর কথা স্মরণ করে ডাঃ পালচৌধুরী বলেন, দেশের সীমান্তে প্রতিকূল আবহাওয়া ও বরফঢাকা পাহাড়ের মধ্যে শত শত ভারতীয় সেনা জওয়ান নিরলসভাবে দায়িত্ব পালন করেন বলেই সাধারণ মানুষ নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারেন।
তাই দেশের প্রতিটি সেনা সদস্যের প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা রয়েছে।ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কর্মরত অবস্থায় পাকিস্তানের গুলিতে আহত বহু ভারতীয় সেনা জওয়ানের চিকিৎসা করেছেন তিনি। দেশের সেবাকে জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দায়িত্ব বলে মনে করেন এই প্রাক্তন সেনা চিকিৎসক। আজও তাঁর মনে “বন্দেমাতরম” ধ্বনি এক বিশেষ দেশাত্মবোধক আবেগ সৃষ্টি করে।
বর্তমানে শিলিগুড়ির আনন্দলোক নার্সিং হোম, শান্তি নার্সিং হোম এবং নর্থ বেঙ্গল নিউরোসায়েন্স সেন্টারে নিয়মিত রোগী দেখেন ডাঃ রঞ্জন পালচৌধুরী। তাঁর দক্ষ শল্য চিকিৎসার মাধ্যমে প্রতিদিন বহু রোগী বিভিন্ন শারীরিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাচ্ছেন।
রোগীদের আরও ভালো চিকিৎসা সেবা দেওয়ার জন্য নিজেকেও সুস্থ রাখা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। তাই প্রতিদিন নিয়মিত জিম ও যোগাসন করেন। তাঁর কথায়, “আমার শরীর ভালো থাকলে আমি আরও বেশি প্রাণশক্তি নিয়ে রোগীদের চিকিৎসা করতে পারবো।”
অস্ত্রোপচারের আগে রোগীদের মানসিকভাবে প্রস্তুত করতেও বিশেষ গুরুত্ব দেন তিনি। রোগীর অযথা ভয় ও উদ্বেগ দূর করার জন্য কাউন্সেলিং করেন, যাতে চিকিৎসা সম্পর্কে তাদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের দ্রুত উন্নতির প্রসঙ্গ তুলে তিনি জানান, আধুনিক ল্যাপারোস্কোপিক প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন অত্যাধুনিক যন্ত্রের সাহায্যে বর্তমানে বহু জটিল রোগের চিকিৎসা অনেক সহজ ও কার্যকর হয়ে উঠেছে।
আসন্ন ১ জুলাই চিকিৎসক দিবস উপলক্ষে সকলকে শুভেচ্ছা জানিয়ে ডাঃ পালচৌধুরী বলেন, “কোনো চিকিৎসকই চান না তাঁর রোগীর কোনো ক্ষতি হোক। রোগী সুস্থ হয়ে উঠলে সেটাই চিকিৎসকের সবচেয়ে বড় সাফল্য এবং সম্মান।”
উল্লেখ্য, সম্প্রতি অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে গলব্লাডার স্টোনের ল্যাপারোস্কোপিক অস্ত্রোপচার করে গিনেস বুকে নাম তুলেছেন শিলিগুড়ির এই কৃতী চিকিৎসক, যা শহরের জন্যও এক গর্বের বিষয়।

