১৫ বছরের শাসনের পর নতুন অধ্যায়: ব্রিগেডে শপথ, রামরাজ্যের আদর্শে সুশাসনের বার্তা

নিজস্ব প্রতিবেদক : দীর্ঘ ১৫ বছরের তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের অবসান ঘটিয়ে ৯ মে পশ্চিমবঙ্গে নতুন বিজেপি সরকার শপথ নিয়েছে। ঐতিহাসিক ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে আয়োজিত হতে চলা এই শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে নতুন মুখ্যমন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্বভার গ্রহণ করলেন।

ব্রিগেড ময়দান থেকে রেড রোড, ধর্মতলা এবং পার্ক স্ট্রিট পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রায় ৭০০টি চোঙা বা মাইক বসানোর কাজ শুরু হয়। ধর্মতলা বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত শব্দ পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই প্রতিটি উঁচু ল্যাম্পপোস্টে মাইক লাগানো হয় বলে জানিয়েছেন এক বিদ্যুৎকর্মী। নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠান ঘিরে কলকাতা শহরজুড়ে উৎসবের আবহ ও সাজসাজ রব।

এদিকে বিজেপির প্রবীণ কর্মী ও সমর্থকদের একাংশ এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে “রামরাজ্য”-এর আদর্শের তুলনা টানছেন। তাঁদের বক্তব্য, ভগবান শ্রীরামের আদর্শ ছিল ন্যায়, সত্য, জনকল্যাণ ও ধর্মভিত্তিক শাসনব্যবস্থা। নতুন সরকারও সেই মূল্যবোধকে সামনে রেখেই এগোবে বলে তাঁরা আশা প্রকাশ করেছেন।

রামায়ণ ও রামচরিতমানসে বর্ণিত রামরাজ্যের দশটি মূলনীতি তাঁরা বিশেষভাবে তুলে ধরছেন—

১. সত্য ও প্রতিশ্রুতির মর্যাদা

পিতার দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষার জন্য শ্রীরাম রাজ্য ত্যাগ করে বনবাসে গিয়েছিলেন।

“রঘুকুল রীতি সদা চলি আই,
প্রাণ যায়ে পর বচন ন যাই।”

অর্থাৎ, রঘুকুলের প্রথা হলো—প্রাণ চলে যেতে পারে, কিন্তু কথার খেলাপ করা যায় না। একজন শাসকের প্রধান গুণ হওয়া উচিত প্রতিশ্রুতি রক্ষা।

২. প্রজাদের কল্যাণই রাজধর্ম

রামরাজ্যে মানুষের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।

“দৈহিক দৈবিক ভৌতিক তাপা,
রামরাজ নহি কাহুহি ব্যাপা।”

অর্থ—রামরাজ্যে মানুষ শারীরিক, মানসিক কিংবা সামাজিক কষ্টে ভুগত না। শাসনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করা।

৩. ন্যায়বিচারে নিরপেক্ষতা

শ্রীরাম ব্যক্তিগত সম্পর্কের ঊর্ধ্বে উঠে রাজধর্ম পালন করেছিলেন। রাষ্ট্রের মর্যাদা রক্ষায় তিনি ব্যক্তিগত কষ্টও মেনে নিয়েছিলেন। এই আদর্শ জানায়—আইনের চোখে সবাই সমান এবং বিচারব্যবস্থায় পক্ষপাতের স্থান নেই।

৪. দুর্বল ও অসহায়দের সুরক্ষা

বনবাসকালে ঋষি, সাধু ও সাধারণ মানুষকে রাক্ষসদের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন শ্রীরাম।

“পরহিত সরিস ধরম নহি ভাই।”

অর্থ—অন্যের মঙ্গল করার মতো বড় ধর্ম আর নেই। রাষ্ট্রের দায়িত্ব সমাজের দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ানো।

৫. নৈতিকতা ও ধর্মভিত্তিক শাসন

রামরাজ্যে ধর্ম মানে শুধু আচার নয়, ন্যায় ও নৈতিকতা।

“ধর্ম তে বিরোধ ন হোই কছু ভাই।”

অর্থাৎ, ধর্ম ও নৈতিকতার পথে চললে সমাজে ধ্বংস নেমে আসে না। সৎ ও নীতিনিষ্ঠ প্রশাসনই আদর্শ রাষ্ট্রের ভিত্তি।

৬. পরামর্শভিত্তিক প্রশাসন

শ্রীরাম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে গুরু, মন্ত্রী ও জ্যেষ্ঠদের মতামত গ্রহণ করতেন। বশিষ্ঠ, হনুমান ও জাম্বুবানের মতো জ্ঞানীদের পরামর্শ রামায়ণে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এই শিক্ষা বলে—একনায়কতন্ত্র নয়, সম্মিলিত মতামতের ভিত্তিতেই সুশাসন গড়ে ওঠে।

৭. নারীসম্মান রক্ষা

রামায়ণে নারী অপমানকে গুরুতর অন্যায় হিসেবে দেখানো হয়েছে। সীতাহরণই রাবণের পতনের প্রধান কারণগুলির একটি। এই আদর্শ জানায়—নারীর মর্যাদা ও নিরাপত্তা রক্ষা করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।

৮. শত্রুর প্রতিও ন্যায়নীতি

যুদ্ধক্ষেত্রেও শ্রীরাম নৈতিকতা বজায় রেখেছিলেন। রাবণ আহত হলে তিনি তাকে বিশ্রামের সুযোগ দিয়েছিলেন এবং পরদিন পুনরায় যুদ্ধের আহ্বান জানিয়েছিলেন। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়—প্রতিশোধ নয়, ন্যায়সঙ্গত আচরণই প্রকৃত শক্তির পরিচয়।

৯. অহংকারবর্জিত নেতৃত্ব

শ্রীরাম কখনও রাজশক্তির অহংকার করেননি। তিনি সাধারণ মানুষ, বনবাসী ও ভক্তদের সমান সম্মান দিতেন।

“বড়াই দেখি ন করিঅ অভিমানা।”

অর্থ—ক্ষমতা বা বড়ত্ব পেয়ে অহংকার করা উচিত নয়। বিনয়ী নেতৃত্বই রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল করে।

১০. ঐক্য ও সামাজিক সম্প্রীতি

শ্রীরামের দলে বনবাসী, বানরসেনা, ভল্লুকসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ ছিলেন। সবাইকে সঙ্গে নিয়েই তিনি লঙ্কা জয় করেছিলেন। এই আদর্শ শেখায়—একটি আদর্শ রাষ্ট্র বিভাজনের নয়, বরং ঐক্য ও সম্প্রীতির ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে থাকে।

রামরাজ্যের মূল দর্শন

সত্য, ন্যায়, জনকল্যাণ, নৈতিকতা, নারীসম্মান, দুর্বলদের সুরক্ষা, পরামর্শভিত্তিক প্রশাসন ও অহংকারহীন নেতৃত্ব—এই মূল্যবোধগুলিকেই রামরাজ্যের ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়। সেই কারণেই ভারতীয় সংস্কৃতিতে “রামরাজ্য” আজও আদর্শ সুশাসনের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।