মনসা পালায় জীবন্ত হয়ে ওঠে লোককথা, আজও উত্তরবঙ্গে বেঁচে আছে শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্য

নিজস্ব প্রতিবেদক :
মঞ্চে যেন বাস্তবেই পূজিত হচ্ছেন দেবী মনসা।
চাঁদ সওদাগরের বাম হাতে মনসা পূজার দৃশ্য দেখে আবেগে ভাসেন হাজারো দর্শক।
লোককথা, বিশ্বাস ও সংস্কৃতির অপূর্ব মেলবন্ধন আজও উত্তরবঙ্গের গ্রামবাংলায় ধরে রেখেছে ‘মনসা’ বা ‘বিষহরি’ পালা গানের ঐতিহ্য।
উত্তরবঙ্গের লোকসংস্কৃতির অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ধারার নাম মনসা বা বিষহরি পালা গান। চাঁদ সওদাগর, বেহুলা ও লক্ষিন্দরের জীবনকাহিনীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই পালাগান আজও মালদহ থেকে আলিপুরদুয়ার পর্যন্ত বিভিন্ন জেলায় সমান জনপ্রিয়। কোথাও সাত দিন, কোথাও আবার তিন রাতব্যাপী এই পালাগানের আসর বসে। গান শেষে মঞ্চে চাঁদ সওদাগরের হাতে দেবী মনসার পূজার যে দৃশ্য পরিবেশিত হয়, তা দর্শকদের কাছে যেন বাস্তব পূজার অনুভূতি এনে দেয়।

এই পালাগানের মূল কাহিনী আবর্তিত হয়েছে শিবভক্ত চাঁদ সওদাগর এবং শিবের মানসকন্যা দেবী মনসার দ্বন্দ্বকে ঘিরে। মনসাকে পূজা না দেওয়ায় চাঁদ সওদাগরের ছয় পুত্র সর্পদংশনে প্রাণ হারায়। বাণিজ্যের নৌকাও ডুবে যায়। পরে সপ্তম পুত্র লক্ষিন্দরের সঙ্গে বেহুলার বিয়ের পর বাসর রাতেই লক্ষিন্দরও সর্পদংশনে মারা যান। স্বামীর দেহ নিয়ে দেবলোকে পৌঁছে বেহুলা দেবতাদের সন্তুষ্ট করেন এবং শেষ পর্যন্ত দেবী মনসার কৃপায় লক্ষিন্দর, তাঁর ছয় ভাই এবং হারিয়ে যাওয়া ধনসম্পদ ফিরে পান। বেহুলার অনুরোধ রক্ষার্থে চাঁদ সওদাগর শেষ পর্যন্ত দেবী মনসার পূজা করেন, তবে ডান হাতে নয়—বাম হাতে। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, শিবভক্ত হওয়ায় তিনি যে হাতে মহাদেবের পূজা করতেন, সেই হাতে অন্য কোনও দেবদেবীর পূজা করেননি।

এই কাহিনীই পালাগানের মাধ্যমে আজও জীবন্ত হয়ে ওঠে উত্তরবঙ্গের গ্রামবাংলার মঞ্চে। জেলার ভেদে ভাষা ও উপস্থাপনার কিছু পার্থক্য থাকলেও প্রতিটি দলের মূল বিষয়বস্তু একই—বেহুলা-লক্ষিন্দর ও চাঁদ সওদাগরের কিংবদন্তি।

বিশেষ করে রাজবংশী সম্প্রদায়ের মধ্যে এই পালাগানের প্রচলন এখনও অত্যন্ত শক্তিশালী। বিবাহ অনুষ্ঠান, মানত পূরণ কিংবা বিশেষ ধর্মীয় উপলক্ষে অত্যন্ত নিয়ম-নিষ্ঠার সঙ্গে এই গানের আসর বসানো হয়। ফলে এটি শুধু বিনোদন নয়, উত্তরবঙ্গের সামাজিক ও ধর্মীয় জীবনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সম্প্রতি মালদহ জেলার চাঁচল ব্লকের শংকরকোলা গ্রামে তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত মনসা গানের আসরে পরিবেশন করে শ্রীরামপুরের ‘দাদাভাই নাগমাতা’ দল। দলের শিল্পী দীপক দাস, রিন্টু দাস, শিবু দাস, সুরজিৎ হালদার ও প্রশান্ত ঘোষ জানান, জীবিকার জন্য নয়, এই প্রাচীন লোকসংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা থেকেই তাঁরা মনসা পালা গান পরিবেশন করে চলেছেন।

তবে তাঁদের আক্ষেপ, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের বহু লোকশিল্পী লোকপ্রসার প্রকল্পের মাধ্যমে শিল্পী ভাতা পেলেও মালদহ জেলার চাঁচল ব্লকের বহু শিল্পী এখনও সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত। তাই তাঁরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানিয়েছেন, রাজ্যের অন্যান্য লোকশিল্পীদের মতো তাঁদেরও শিল্পী ভাতা এবং সরকারি লোকশিল্পী পরিচয়পত্র প্রদান করা হোক।

অন্যদিকে, শংকরকোলা গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা ও আয়োজক কমিটির কর্ণধার বীরেন ঘোষ, পূর্ণিমা ঘোষ, রূপালি ঘোষ-সহ এলাকাবাসীর বক্তব্য, মনসা বা বিষহরি পালা গান উত্তরবঙ্গের গ্রামবাংলার অমূল্য ঐতিহ্য। এই লোকসংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে নতুন প্রজন্মকে এগিয়ে আসতে হবে এবং সরকারি উদ্যোগে আরও বেশি পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজন।

প্রতিবেদন: বর্ষীয়ান সাংবাদিক ও প্রবীণ লোকশিল্পী সুবল গোপ
উত্তরবঙ্গের সংস্কৃতির সন্ধানে – খবরের ঘন্টা, শিলিগুড়ি।