নিজস্ব প্রতিবেদন: এখন পশ্চিমবঙ্গে সাংবাদিকদের মাসে পাঁচ হাজার টাকা ভাতা, ট্রেন ভাড়া অর্ধেক করা এবং আরও কিছু কল্যাণমূলক প্রকল্প চালু করার আলোচনা চলছে। সেই বিষয়টিকে সামনে রেখেই আমার এই লেখা বা প্রস্তাব।

আমি দীর্ঘ ৩৬ বছর ধরে সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত। আদর্শের টানে, নেশার টানে সাংবাদিকতা করবো বলেই সরকারি চাকরির চেষ্টা করিনি বয়স থাকার সময়। আজও সংবাদমাধ্যমকে শুধু পেশা নয়, সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার জায়গা হিসেবেই দেখি।তবে বাস্তব ছবিটাও আজ অত্যন্ত কঠিন।
যাঁরা বড় বড় সংবাদমাধ্যমে মোটা বেতনের চাকরি করেন, তাঁদের কথা আলাদা। কিন্তু জেলায় জেলায় অসংখ্য প্রবীণ, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিক রয়েছেন, যাঁরা আজও সংগ্রাম করে সংবাদপত্র, পোর্টাল বা স্থানীয় সাংবাদিকতা বাঁচিয়ে রেখেছেন। বিশেষ করে করোনা পরবর্তী সময়ে তাঁদের আর্থিক অবস্থা আরও সঙ্গীন হয়েছে।
প্রতিদিনের বাজার-ঘাট, সংসার চালানো, নিজের ও পরিবারের চিকিৎসার খরচ বহন করা— সব কিছু নিয়েই তাঁরা উদ্বিগ্ন।অনেক ছোট পত্রিকা ও ডিজিটাল পোর্টাল আজও শুধুমাত্র দায়বদ্ধতা আর ভালোবাসার জায়গা থেকে টিকে আছে। তাই সরকারের কাছে বিনীতভাবে কিছু বাস্তবসম্মত প্রস্তাব রাখতে চাই।আমার প্রস্তাবসমূহ :
১) সাংবাদিকদের জন্য মাসিক ভাতা চালু হোক
তবে সেটি বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে হোক। যাঁরা বৃহৎ সংবাদমাধ্যমে উচ্চ বেতনে কর্মরত, তাঁদের ক্ষেত্রে ভাতার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। কিন্তু জেলা ও প্রান্তিক স্তরের বহু সাংবাদিকের জন্য এই ভাতা অত্যন্ত জরুরি সহায়তা হতে পারে।
২) সাংবাদিকদের জন্য আবাসন প্রকল্প চালু করা হোক
অনেক প্রবীণ সাংবাদিক আজও স্থায়ী বাসস্থানের নিরাপত্তা পাননি। স্বল্পমূল্যে আবাসন বা বিশেষ হাউজিং প্রকল্প তাঁদের জন্য বড় সহায়তা হতে পারে।
৩) সাংবাদিক ও তাঁদের পরিবারের জন্য বিশেষ স্বাস্থ্য কার্ড চালু হোক
চিকিৎসা আজ অত্যন্ত ব্যয়বহুল। সাংবাদিকদের জন্য বিশেষ হেলথ কার্ড, ক্যাশলেস চিকিৎসা বা স্বাস্থ্য বিমা প্রকল্প চালু করা সময়ের দাবি।
৪) ট্রেনের পাশাপাশি অন্যান্য পরিবহন ব্যবস্থাতেও বিশেষ সুবিধা দেওয়া হোক
সাংবাদিকদের প্রতিনিয়ত বিভিন্ন জায়গায় ছুটতে হয়। তাই বাসসহ অন্যান্য পরিবহনে বিশেষ পরিবহন কার্ড বা ভাড়া ছাড়ের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
৫) ক্ষুদ্র সংবাদপত্র ও ডিজিটাল পোর্টালগুলোর জন্য বিশেষ বিজ্ঞাপন প্যাকেজ চালু হোক
যেসব ছোট সংবাদমাধ্যম সীমিত সামর্থ্য নিয়ে সমাজমুখী ও গঠনমূলক কনটেন্ট তৈরি করছে, বিশেষ করে যাদের অন্তত ৩০ হাজার ফলোয়ার রয়েছে এবং নিয়মিত দায়িত্বশীল সংবাদ পরিবেশন করছে, তাদের জন্য সরকারি বিজ্ঞাপন নীতিতে আলাদা প্যাকেজ থাকা দরকার। এতে স্থানীয় সাংবাদিকতা বাঁচবে।
৬) সরকারি বিজ্ঞাপন যেন সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা কেড়ে না নেয়
প্রিন্ট হোক বা ডিজিটাল— সরকারি বিজ্ঞাপন পেলেই সংবাদমাধ্যম শুধু সরকারের প্রশংসা করবে, এমন সংস্কৃতি গণতন্ত্রের পক্ষে ভালো নয়। সরকার যেন সংবাদমাধ্যমকে “অন্ধ অনুগত” না বানিয়ে গঠনমূলক সমালোচনার পরিবেশ তৈরি করে। সরকারের ভুলত্রুটি যেন সংবাদমাধ্যম স্বাধীনভাবে, অবশ্যই মার্জিত ও দায়িত্বশীল ভঙ্গিতে তুলে ধরতে পারে।
৭) সাংবাদিকদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা হোক
মাঠে কাজ করতে গিয়ে বহু সাংবাদিক হেনস্থা, হুমকি বা আক্রমণের শিকার হন। তাঁদের নিরাপত্তার জন্য স্পষ্ট নীতি ও দ্রুত প্রশাসনিক সহায়তা জরুরি।
৮) প্রকৃত ও দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যমকে স্বীকৃতি দেওয়া হোক
আজকাল হঠাৎ “বুম” তৈরি করে যে কেউ ফেসবুক পেজ খুলে সাংবাদিক পরিচয় দিচ্ছেন। ফলে প্রকৃত সাংবাদিকতা অনেক সময় প্রশ্নের মুখে পড়ছে। তাই শুধুমাত্র নামের জন্য নয়, বরং উন্নত কনটেন্ট, সামাজিক দায়বদ্ধতা, তথ্যনিষ্ঠ প্রতিবেদন ও দেশ-সমাজের স্বার্থে কাজ করা সংবাদমাধ্যম ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের মূল্যায়ন ও পুরস্কৃত করার ব্যবস্থা হওয়া প্রয়োজন।
শেষ কথা
সাংবাদিকতা শুধু একটি পেশা নয়, এটি সমাজের দর্পণ। গণতন্ত্রের অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে সংবাদমাধ্যমকে শক্তিশালী রাখতে হলে সাংবাদিকদের ন্যূনতম সামাজিক ও মানবিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
আমি বিশ্বাস করি, সরকার যদি বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে সুসংগঠিত সাংবাদিক কল্যাণ নীতি গ্রহণ করে, তাহলে উপকৃত হবেন হাজার হাজার প্রবীণ, প্রান্তিক ও সংগ্রামী সাংবাদিক। একই সঙ্গে আরও দায়িত্বশীল, স্বাধীন ও সমাজমুখী সাংবাদিকতা গড়ে উঠবে।
— বাপি ঘোষ
সম্পাদক, “খবরের ঘন্টা”
শিলিগুড়ি

