দারিদ্র্যকে হার মানিয়ে ছেলেকে ইঞ্জিনিয়ার বানানোর স্বপ্নে লড়াই সুকারু রায়ের

নিজস্ব প্রতিবেদক : অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। সংসারের আর্থিক টানাপোড়েনের কারণে নিজের পড়াশোনার স্বপ্ন মাঝপথেই থেমে গিয়েছিল। তবুও হার মানেননি শিলিগুড়ি গার্লস হাইস্কুলের কেয়ারটেকার সুকারু রায়, যিনি সুকান্ত নামেও পরিচিত। জীবনের কঠিন সংগ্রামের মধ্যেও তিনি একটাই স্বপ্ন বুকে লালন করেছেন— সন্তানদের শিক্ষিত করে বড় মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা।

কোচবিহারের রানীরহাট গ্রামের বাসিন্দা সুকারু ১৯৯৭ সালে কাজের সন্ধানে বাড়ি ছাড়েন। আর্থিক অনটনের কারণে মাত্র পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করতে পেরেছিলেন তিনি। কিন্তু শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হলেও মানবিক মূল্যবোধ ও স্বপ্ন কখনও তাঁকে ছেড়ে যায়নি। স্বামী বিবেকানন্দের বাণী— “জীবে প্রেম করে যেইজন, সেইজন সেবিছে ঈশ্বর”— তাঁর জীবনের প্রেরণা হয়ে ওঠে।

সন্তানদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করার লক্ষ্যেই ২০০৭ সালে শিলিগুড়ি গার্লস হাইস্কুলে কেয়ারটেকারের কাজ শুরু করেন সুকারু। স্কুলের দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি জীবিকার প্রয়োজনে একসময় শহরের রাস্তায় রিকশাও চালিয়েছেন। বর্তমানে নিয়মিত টোটো চালিয়ে সংসারের হাল ধরেছেন তিনি।

অন্যদিকে তাঁর স্ত্রীও সমানভাবে সংগ্রামের সঙ্গী। তিনি শিলিগুড়ি বয়েজ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মিড-ডে মিল কর্মী হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি ব্লাউজ সেলাই করে সংসারে আর্থিক সহায়তা করেন। স্বামী-স্ত্রীর নিরলস পরিশ্রমের একটাই উদ্দেশ্য— ছেলে-মেয়েকে উচ্চশিক্ষিত করে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করা।

তাঁদের সেই লড়াই আজ ধীরে ধীরে সাফল্যের মুখ দেখছে। ছেলে অভিজিৎ রায় শিলিগুড়ি বয়েজ হাইস্কুল থেকে উচ্চমাধ্যমিকে ৪২৫ নম্বর পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে। শুধু তাই নয়, রবিবার সে জেইই অ্যাডভান্সড পরীক্ষাতেও অংশ নিয়েছে। ভবিষ্যতে ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন নিয়েই এগোচ্ছে অভিজিৎ। অন্যদিকে তাঁদের মেয়ে শিলিগুড়ি গার্লস হাইস্কুলের ছাত্রী এবং একজন মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে ইতিমধ্যেই পরিচিতি পেয়েছে।

সন্তানদের শুধু পড়াশোনাতেই নয়, মানবিক মূল্যবোধেও বড় করে তুলতে চান সুকারু রায়। তিনি চান, তাঁর সন্তানরা ভবিষ্যতে সমাজ ও দেশের জন্য কাজ করুক। সেই শিক্ষাই তিনি তাঁদের প্রতিনিয়ত দিয়ে চলেছেন।

রবিবার শিলিগুড়ি গার্লস হাইস্কুল প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে অভিজিৎ রায়কে সংবর্ধনা জানানো হয়। অভিজিতের অনুপস্থিতিতে সেই সম্মান গ্রহণ করেন তাঁর বাবা সুকারু রায়। আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, “ছেলে যেন বড় মানুষ হয়, এটাই আমার প্রার্থনা।”

অন্যদিকে অভিজিৎ জানায়, বাবার আদর্শ ও পরামর্শ মেনেই সে ভবিষ্যতে দেশ ও সমাজের কল্যাণে কাজ করতে চায়।অভাবের বিরুদ্ধে এই পরিবারের লড়াই আজ অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে উঠেছে।