নৈতিক শিক্ষার পাঠে অনন্য উদ্যোগ, আলাদা পরিচিতি গড়ছে মাতঙ্গিনী শিশু নিকেতন

নিজস্ব প্রতিবেদক : স্কুলে দিনের শুরুতেই প্রার্থনা লাইনে ছোট ছোট পড়ুয়াদের কণ্ঠে ভেসে ওঠে নৈতিকতার শপথ— “সবসময় সত্য কথা বলবো”, “অন্যের জিনিসের প্রতি লোভ করবো না”, “মা-বাবা ও গুরুজনদের শ্রদ্ধা করবো।” শুধু শপথ নয়, প্রতিদিনের প্রার্থনা সভায় নিয়ম করে হয় সরস্বতী বন্দনাও।

শৈশব থেকেই শিশুদের মধ্যে মানবিকতা ও নৈতিক মূল্যবোধ গড়ে তুলতে এমন অভিনব উদ্যোগ নিয়েছে শিলিগুড়ি শহর সংলগ্ন ইস্টার্ন বাইপাসের জলেশ্বরীর পাশে হাতিয়াডাঙ্গায় অবস্থিত বাংলা মাধ্যমের বিদ্যালয় ‘মাতঙ্গিনী শিশু নিকেতন’।

মাতঙ্গিনী এডুকেশনাল ট্রাস্ট পরিচালিত এই বিদ্যালয়ে প্রি-নার্সারি থেকে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনার সুযোগ রয়েছে। ২০০০ সালে পথচলা শুরু হওয়া এই স্কুল মূলত এলাকার পিছিয়ে পড়া পরিবারের শিশুদের শিক্ষার মূল স্রোতে আনার লক্ষ্যেই গড়ে তোলা হয়েছিল।

শিক্ষানুরাগী সঞ্জীব কুমার দাস ও তাঁর স্ত্রী চন্দ্রালিকা দাস নিজেদের উদ্যোগে এই প্রতিষ্ঠান চালাচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রেই ব্যক্তিগত ভর্তুকি দিয়ে স্কুলের কার্যক্রম বজায় রাখতে হচ্ছে তাঁদের। উল্লেখযোগ্য বিষয়, ‘মাতঙ্গিনী’ নামটি সঞ্জীববাবুর মায়ের নাম, মায়ের স্মৃতিকে সম্মান জানাতেই বিদ্যালয়ের এই নামকরণ।

স্কুলের প্রার্থনা সভায় নৈতিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিদিন গাওয়া হয় জাতীয় সঙ্গীত ‘জনগণমন’ এবং ‘বন্দেমাতরম’। বর্তমানে বন্দেমাতরম বাধ্যতামূলক হওয়ায় তা নিয়মিতভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। শুধু পাঠ্যশিক্ষাই নয়, ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও সহমর্মিতার শিক্ষা দিতেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয় এখানে। কারও জন্মদিন থাকলে প্রেয়ার লাইনে করতালির মাধ্যমে তাকে শুভেচ্ছা জানায় অন্য পড়ুয়ারা।

বিদ্যালয়ে শিশুদের শেখানো হয় অন্যের দুঃখে পাশে দাঁড়াতে, টিফিন ভাগ করে খেতে এবং সততার মূল্য বুঝতে। কেউ যদি অন্য কারও পেন্সিল, রাবার বা অন্য কোনো জিনিস পায়, তবে তা লুকিয়ে না রেখে সবার সামনে ফেরত দেওয়ার অভ্যাসও গড়ে তোলা হচ্ছে ছোটদের মধ্যে।

নামমাত্র ফি-তে চলা এই বিদ্যালয়ে কম্পিউটার শিক্ষার পাশাপাশি সঙ্গীত, আবৃত্তি ও অঙ্কনের প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়। বাংলা মাধ্যম হলেও ইংরেজি শিক্ষার উপরও বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন মনীষীর জন্মজয়ন্তী এবং বাংলা ও ভারতীয় সংস্কৃতির নানা উৎসবও যথাযথ মর্যাদায় পালন করা হয় স্কুলে।

বিদ্যালয়ের কর্ণধার সঞ্জীব কুমার দাস ও চন্দ্রালিকা দাস জানান, আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারের শিশুরাও যাতে সঠিক শিক্ষা ও মূল্যবোধের মাধ্যমে ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে, সেই লক্ষ্য নিয়েই তাঁদের এই প্রয়াস। তাঁদের দাবি, এই স্কুল থেকেই প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে আজ বিজ্ঞানীর আসনে পৌঁছেছেন রাজু দাস, যা বিদ্যালয়ের কাছে অত্যন্ত গর্বের বিষয়।