প্রতিবেদন : বাপি ঘোষ
নিজস্ব প্রতিবেদন :
চিকিৎসক দিবসকে সামনে রেখে আবারও আলোচনায় উঠে আসছেন শিলিগুড়ির কিংবদন্তি চিকিৎসক প্রয়াত ডাঃ কে. এন. চ্যাটার্জী, যিনি সাধারণ মানুষের কাছে “কালু ডাক্তার” নামেই অধিক পরিচিত ছিলেন। উত্তরবঙ্গের চিকিৎসা ইতিহাসে তাঁর নাম আজও গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। অনেকেই তাঁকে “উত্তরবঙ্গের বিধান রায়” বলে অভিহিত করতেন, আবার অসংখ্য মানুষের কাছে তিনি ছিলেন ভগবানতুল্য চিকিৎসক।

ডাঃ কে. এন. চ্যাটার্জীর জন্ম ১৯১২ সালে এবং তিনি প্রয়াত হন ২৭ জুলাই ১৯৯২ সালে। শিলিগুড়ির হিলকার্ট রোডে তাঁর বিখ্যাত কাঠের বাড়ি ছিল, যা একসময় শহরের অন্যতম পরিচিত স্থাপনা হিসেবে বিবেচিত হতো। বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে সত্তরের দশক পর্যন্ত শিলিগুড়ি ও উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তাঁর চিকিৎসাসেবা মানুষের আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছিল।
স্বাধীনতা-উত্তর পশ্চিমবঙ্গের প্রখ্যাত চিকিৎসক ও মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়ের সঙ্গেও ছিল তাঁর নিবিড় যোগাযোগ। ২৩ জানুয়ারি ১৯৪৮ সালে পশ্চিমবঙ্গের প্রিমিয়ার এবং ২৬ জানুয়ারি ১৯৫০ সালে রাজ্যের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করা ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় ১ জুলাই ১৯৬২ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রায় ১৪ বছর রাজ্যের নেতৃত্ব দেন। উত্তরবঙ্গের স্বাস্থ্য ও উন্নয়ন সংক্রান্ত বিষয়ে তিনি নিয়মিত খোঁজখবর রাখতেন এবং একাধিকবার শিলিগুড়ি সফর করেছিলেন।
স্থানীয় প্রবীণদের স্মৃতিচারণে জানা যায়, ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় শিলিগুড়ি এলে বা বাগডোগরা বিমানবন্দরে পৌঁছালে কালু ডাক্তার তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন। চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্য নিয়ে তাঁদের মধ্যে আলোচনা হতো। এমনকি ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়ের কাছেও শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন কালু ডাক্তার বলে জানা যায়।
প্রয়াত চিকিৎসকের পৌত্র, বিশিষ্ট দন্ত বিশেষজ্ঞ ডাঃ সোমজিৎ চ্যাটার্জী তাঁর ঠাকুরদার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, চিকিৎসাকে তিনি কখনও শুধু পেশা হিসেবে দেখেননি; মানুষের সেবা করাকেই জীবনের মূল লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। রোগীদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল আত্মীয়তার মতো। গরিব মানুষের চিকিৎসার জন্য তিনি অনেক সময় ফি নিতেন না, আবার প্রয়োজনে দূরদূরান্তে ছুটে যেতেন।
আজকের দিনে শিলিগুড়ি উত্তরবঙ্গের অন্যতম চিকিৎসা নগরী। আধুনিক হাসপাতাল, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, উন্নত ডায়াগনস্টিক ব্যবস্থা ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তির কারণে চিকিৎসা পরিষেবা অনেক এগিয়েছে। কিন্তু ষাট ও সত্তরের দশকে পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
তখন এত চিকিৎসক, এত উন্নত যন্ত্রপাতি কিংবা বর্তমানের মতো যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল না। সেই সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেই কালু ডাক্তারের মতো চিকিৎসকেরা তাঁদের মেধা, অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার মাধ্যমে অসংখ্য মানুষের চিকিৎসা করেছেন।
শিলিগুড়ির প্রখ্যাত লেখক ও অবসরপ্রাপ্ত চিকিৎসক ডাঃ গৌরিশঙ্কর ভট্টাচার্য জানান, কালু ডাক্তার ছিলেন বামপন্থী আদর্শে বিশ্বাসী একজন মানুষ। তবে রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে তিনি গরিব ও অসহায় মানুষের সেবাকে প্রাধান্য দিতেন। চা-বাগান এলাকায় সাইকেল চালিয়ে গিয়ে চিকিৎসা পরিষেবা পৌঁছে দিতেন।
আবার গ্রামীণ কাঁচা রাস্তা ও গরুর গাড়ির যুগের শিলিগুড়িতে নিজের গাড়ি নিয়ে রোগীদের বাড়িতেও পৌঁছে যেতেন। সেই সময় শহরে ব্যক্তিগত গাড়ি ছিল বিরল, ফলে তাঁর গাড়ি দেখতে ও ছুঁয়ে দেখতে অনেক মানুষ ভিড় জমাতেন।
প্রবীণদের মুখে এখনও শোনা যায় তাঁর অসাধারণ রোগ নির্ণয়ের ক্ষমতার কথা। আধুনিক স্ক্যান, আলট্রাসোনোগ্রাফি বা উন্নত পরীক্ষার ব্যবস্থা না থাকলেও রোগীর উপসর্গ ও শারীরিক পরীক্ষা করেই তিনি অনেক সময় সঠিক রোগ নির্ণয় করতে সক্ষম হতেন। তাঁর এই দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে।
নিজের স্বাস্থ্য নিয়েও তিনি ছিলেন অত্যন্ত সচেতন। প্রতিদিন নিয়মিত শরীরচর্চা করতেন এবং ব্যস্ততার মাঝেও পড়াশোনা চালিয়ে যেতেন। রোগী দেখতে যাওয়ার সময় গাড়ির মধ্যেও বই পড়তেন। শুধু বই পড়ার সুবিধার জন্য গাড়িতে আলাদা আলো লাগানোর ঘটনাও আজ কিংবদন্তির অংশ হয়ে রয়েছে।
সেই সময়ের শিলিগুড়ি আজকের মতো বিস্তৃত শহর ছিল না। হিলকার্ট রোড ও এস.এফ. রোডকে কেন্দ্র করেই শহরের মূল কর্মকাণ্ড আবর্তিত হতো। উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজ তখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। পাহাড়, ডুয়ার্স, তরাই ও সীমান্তবর্তী এলাকার বহু মানুষ চিকিৎসার জন্য শিলিগুড়িতে আসতেন এবং তাঁদের অনেকেরই ভরসার নাম ছিলেন কালু ডাক্তার।
চিকিৎসক দিবসের প্রাক্কালে উত্তরবঙ্গের এই কিংবদন্তি চিকিৎসককে ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ডাঃ সোমজিৎ চ্যাটার্জী ও ডাঃ গৌরিশঙ্কর ভট্টাচার্যের স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে এক মানবিক চিকিৎসকের অনন্য জীবনকথা। সময় বদলেছে, চিকিৎসা প্রযুক্তি এগিয়েছে, কিন্তু মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা, সহমর্মিতা এবং সেবার আদর্শে কালু ডাক্তার আজও শিলিগুড়ির মানুষের হৃদয়ে অমর হয়ে আছেন।

