বাপি ঘোষ, শিলিগুড়ি: তাঁকে এক ঝলক দেখতেই ভিড়। কেউ সেলফি তুলতে ব্যস্ত, কেউ আবার দু’হাত জোড় করে প্রণাম করছেন। অথচ ৯৭ বছরের এই প্রবীণ মানুষটির মুখে বারবার একটাই কথা— “দেশের কথা সবাই ভেবো। কারণ দেশ সবার আগে।”সাদামাটা জীবন, কঠোর শৃঙ্খলা, অটুট দেশপ্রেম আর বিস্ময়কর স্মৃতিশক্তি— আজও সেই মূল্যবোধের জীবন্ত প্রতীক শিলিগুড়ির মাখনলাল সরকার।

৯৭ বছর বয়সেও যেন বয়সকে হার মানিয়েছেন শিলিগুড়ির সূর্যনগরের বাসিন্দা মাখনলাল সরকার। শরীরের ক্লান্তি যেন তাঁকে ছুঁতেই পারেনি। প্রতিদিন ভোর পাঁচটায় ঘুম থেকে উঠে নিয়মিত হাঁটাহাঁটি দিয়ে দিনের সূচনা করেন। দুপুরের খাবার সেরে নেন দুপুর একটা থেকে দেড়টার মধ্যে, আর রাত দশটার মধ্যেই ঘুম। পরিমিত খাদ্যাভ্যাস ও সুশৃঙ্খল জীবনযাপনই তাঁর সুস্বাস্থ্য ও কর্মক্ষমতার মূল রহস্য বলে মনে করেন পরিবারের সদস্যরা।
এই শৃঙ্খলার শিক্ষা তিনি পেয়েছিলেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) প্রশিক্ষণ পর্বে। সেই সময় বৈকুণ্ঠপুর জঙ্গল থেকে মহানন্দা সেতু, আবার দার্জিলিং মোড় থেকে রংটং পর্যন্ত দীর্ঘ দৌড় ছিল তাঁদের নিত্যদিনের অনুশীলনের অংশ।সেই অনুশীলনের সময়ই ঘটেছিল কয়েকটি রোমহর্ষক ঘটনা। একদিন ভোরে মহানন্দা সেতুর কাছে ডাকাতদল পালিয়ে যাওয়ার সময় তিনি ও তাঁর এক সহযোদ্ধা প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে মহানন্দা নদীতে ঝাঁপ দেন।
সাঁতরে গিয়ে সশস্ত্র ডাকাতদের আটকে পুলিশের হাতে তুলে দেন। আবার অন্য একদিন দার্জিলিং মোড় এলাকায় দৌড়ানোর সময়ও একদল দুষ্কৃতীকে আটক করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। অথচ এসব ঘটনার কোনও প্রচার তিনি কখনও চাননি। নীরবে, নিঃস্বার্থভাবে দেশসেবাকেই তিনি জীবনের প্রধান ব্রত করে নিয়েছিলেন।
সম্ভবত সেই কারণেই বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, সংসদ সদস্য ও রাজনীতিবিদ ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি তাঁর ঐতিহাসিক কাশ্মীর সফরে তরুণ মাখনলাল সরকারকে সঙ্গী হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। তবে সফরের আগে তিনি শুধু একটি কথাই বলেছিলেন— “তুমি আগে তোমার মায়ের অনুমতি নিয়ে এসো।” মায়ের সম্মতি নিয়েই তিনি সেই ঐতিহাসিক সফরের সঙ্গী হন।
আগামী ৬ জুলাই ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির ১২৫তম জন্মবার্ষিকী। এই উপলক্ষে পশ্চিমবঙ্গ সরকার রাজ্যজুড়ে সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছে। কলকাতায় আয়োজিত বিশেষ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সেই অনুষ্ঠানে শিলিগুড়ি থেকে বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রিত হয়েছেন মাখনলাল সরকারও।
এর আগেও পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে তিনি বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। সেই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁর পা স্পর্শ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। সেই দৃশ্য দেশজুড়ে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।
কলকাতা থেকে শিলিগুড়িতে ফেরার পর থেকেই তাঁর বাড়িতে যেন মানুষের ঢল নেমেছে। ফুল, মালা, শুভেচ্ছা আর অভিনন্দনে প্রতিদিন ভরে উঠছে সূর্যনগরের বাড়ি। পরিবারের সদস্যরা অতিথিদের সামলাতেই ব্যস্ত। অথচ ৯৭ বছরের প্রবীণ এই মানুষটি সকলকে হাসিমুখে স্বাগত জানিয়ে চলেছেন।
শনিবার খবরের ঘন্টা-র মুখোমুখি হয়ে বর্তমানের এই প্রবীণ বিজেপি নেতা আজকের রাজনীতিতে দুর্নীতি ও অবক্ষয়ের প্রসঙ্গে স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “রাজনীতিতে দুর্নীতি কমাতে হলে রাজনীতি করা মানুষের মধ্যে শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং দেশপ্রেম বৃদ্ধি করতে হবে।”
তাঁর বিশ্বাস, সততা, আদর্শ এবং দেশপ্রেমকে সামনে রেখে নিরলস কাজ করলে তার মূল্য একদিন না একদিন অবশ্যই মানুষ দেয়। দীর্ঘদিন নানা রাজনৈতিক কারণে পশ্চিমবঙ্গে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির অবদান যথাযথ মর্যাদা পায়নি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে ইতিহাস নিজের বিচার নিজেই করে। ১৯৫১ সালে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির প্রতিষ্ঠিত ভারতীয় জনসংঘ পরবর্তীকালে ভারতীয় জনতা পার্টি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং আজ সেই দলই পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় রয়েছে।
আজ ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি আর নেই, কিন্তু তাঁর সফরসঙ্গী মাখনলাল সরকার এখনও জীবন্ত ইতিহাস হয়ে মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। তাই তাঁকে একনজর দেখতে প্রতিদিন ভিড় বাড়ছে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শ্রদ্ধা নিবেদনের পর তাঁকে নিয়ে মানুষের কৌতূহল ও আগ্রহ আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
ইতিমধ্যেই কলকাতার এক অধ্যাপক তাঁর জীবন ও সংগ্রাম নিয়ে উচ্চমানের তথ্যচিত্র নির্মাণের প্রস্তুতি শুরু করেছেন। একটি পূর্ণাঙ্গ টিম নিয়ে তাঁরা শিলিগুড়িতে এসে তথ্য সংগ্রহ করছেন।রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রে থাকলেও ব্যক্তিগত জীবনে তিনি আজও অত্যন্ত সাধারণ। নিজের কাজ নিজেই করেন। গামছা পরে স্নান করা থেকে শুরু করে মাথায় নিজে নারকেল তেল মাখা— সবই নিজের হাতে। অহংকার, কটূক্তি, পরনিন্দা কিংবা প্রচারের মোহ— কোনও কিছুরই স্থান নেই তাঁর জীবনে।
পরিবারের দাবি, প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীর আমলে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তপন শিকদার তাঁকে কেন্দ্রীয় সরকারের চাকরির প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু ব্যক্তিগত সুবিধার কথা না ভেবে তিনি সেই প্রস্তাবও বিনয়ের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেন।
ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির নাম কিংবা আরএসএসের পরিচয় ব্যবহার করে ব্যক্তিগত সম্পদ বা সুযোগ-সুবিধা আদায়ের কোনও চেষ্টা তিনি বা তাঁর পরিবার কখনও করেননি। বরং সততা, আদর্শ, দেশপ্রেম এবং কঠোর আত্মনিয়ন্ত্রণের জীবনই তাঁকে আজও আলাদা মর্যাদা এনে দিয়েছে।
এই বয়সেও প্রয়োজনে শিক্ষা ও সংস্কৃতির কাজে সারাদিন ফলমূল খেয়ে কাটিয়ে দিতে পারেন তিনি। তাঁর প্রখর স্মৃতিশক্তি আজও বিস্মিত করে অনেককে।এমন এক বিরল ব্যক্তিত্বকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করা এবং তাঁর পরিবারের জন্য বিশেষ পেনশনের ব্যবস্থা করার দাবিও এখন বিভিন্ন মহল থেকে জোরালোভাবে উঠতে শুরু করেছে।
প্রতিবেদন: বাপি ঘোষ, খবরের ঘন্টা।

