অনলাইন নয়, বাজারেই ফিরুক বাঙালির প্রাণ—স্বাস্থ্য, ধৈর্য ও ঐতিহ্যের পক্ষে নির্মল পালের বার্তা

নিজস্ব প্রতিবেদক : শহরের দ্রুতগতির জীবনে যখন অনলাইন কেনাকাটা দিন দিন অভ্যাসে পরিণত হচ্ছে, তখন সেই প্রবণতার বিপরীতে এক ভিন্ন মত তুলে ধরলেন শিলিগুড়ির বিশিষ্ট ব্যবসায়ী তথা হায়দরপাড়া ব্যবসায়ী সমিতির কার্যকরী কমিটির সদস্য নির্মল কুমার পাল, যিনি এলাকায় ‘নিমাই’ নামেই অধিক পরিচিত। বাংলা নববর্ষকে সামনে রেখে তাঁর এই মতামত যেন একদিকে স্বাস্থ্যসচেতনতার বার্তা, অন্যদিকে হারিয়ে যেতে বসা বাঙালির ঐতিহ্যের প্রতি এক আন্তরিক আহ্বান।

নির্মলবাবুর কথায়, “অনলাইনে বসে কেনাকাটা যতই সহজ মনে হোক না কেন, বাজারে গিয়ে হেঁটে হেঁটে জিনিস কেনার যে উপকারিতা, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।” তাঁর মতে, বাজারে ঘুরে কেনাকাটা করলে শরীরচর্চা স্বাভাবিকভাবেই হয়ে যায়। হাঁটাচলার মাধ্যমে শরীরের অতিরিক্ত মেদ কমে, সুগার নিয়ন্ত্রণে থাকে, এমনকি মানসিক প্রশান্তিও পাওয়া যায়। প্রতিদিনের এই ছোট ছোট অভ্যাসই দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ জীবনের পথ তৈরি করে।

শুধু শারীরিক উপকারিতাই নয়, বাজারে গিয়ে কেনাকাটার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেন তিনি—ধৈর্য। ভিড়, যানজট বা দোকানে অপেক্ষার সময় পার করার মধ্যে দিয়েই মানুষের সহনশীলতা বাড়ে। এই অভিজ্ঞতা মানুষকে আরও সংযত ও সহিষ্ণু করে তোলে, যা আজকের তাড়াহুড়োর জীবনে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

অন্যদিকে, অনলাইন কেনাকাটার বিভিন্ন অসুবিধার কথাও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন নির্মলবাবু। তিনি বলেন, “অনলাইনে কেনাকাটা করলে অনেক সময় পণ্যের গুণমান নিয়ে সন্দেহ থাকে। তাছাড়া স্থানীয় দোকানদারের মতো বাকিতে জিনিস কেনার সুবিধাও সেখানে পাওয়া যায় না।” এর পাশাপাশি তিনি সাইবার প্রতারণার ঝুঁকির বিষয়েও সতর্ক করেন।

তাঁর মতে, “আজকাল অনলাইন প্রতারণা বা সাইবার ক্রাইম যেভাবে বাড়ছে, তাতে অসাবধানতাবশত মুহূর্তের মধ্যে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। কিন্তু স্থানীয় দোকান থেকে কেনাকাটা করলে সেই ভয় থাকে না।”
সকলকে বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে নির্মলবাবু আরও বলেন, সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলাচ্ছে, কিন্তু সেই পরিবর্তনের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য।

“বাংলার বারো মাসে তেরো পার্বণ—প্রতিটি উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে প্রকৃতি ও ঋতুর সম্পর্ক। কিন্তু আজকের প্রজন্মের মধ্যে সেই সচেতনতার অভাব দেখা যাচ্ছে,”—মন্তব্য তাঁর।তিনি আক্ষেপের সুরে জানান, ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষার প্রতি অতিরিক্ত ঝোঁক অনেক তরুণকে বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি, বঙ্গাব্দ কিংবা বাংলা মাস-তারিখ থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।

একসময় পয়লা বৈশাখ, হালখাতা, চৈত্র সেল কিংবা নতুন বাংলা ক্যালেন্ডার সংগ্রহকে ঘিরে যে উৎসাহ দেখা যেত, আজ তা অনেকটাই ম্লান।শেষে তাঁর আবেদন, আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়েও যেন আমরা আমাদের শিকড়কে ভুলে না যাই। বাজারে গিয়ে কেনাকাটা শুধু অর্থনৈতিক লেনদেন নয়, এটি এক সামাজিক বন্ধন, এক সাংস্কৃতিক চর্চা—যা আমাদের ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখে। বাংলা নববর্ষের প্রাক্কালে এই বার্তাই তিনি তুলে ধরতে চান সকলের সামনে।