বাপি ঘোষ, শিলিগুড়ি : উত্তরবঙ্গের ইতিহাসে ২৫ মে এক বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ দিন। ১৯০৭ সালের এই দিনেই ব্রিটিশ সরকার কার্শিয়াং মহকুমা থেকে তরাই অঞ্চলকে পৃথক করে শিলিগুড়ি-কে স্বতন্ত্র মহকুমার মর্যাদা দেয়। সেই কারণেই ২৫ মে-কে শিলিগুড়ি মহকুমার “জন্মদিন” হিসেবে মনে করা হয়। ছোট্ট এক তরাই জনপদ থেকে আজকের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও যোগাযোগের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে ওঠার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস, সংগ্রাম এবং ক্রমবিকাশের কাহিনি।

ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ১৮৬৪ সালে দার্জিলিং জেলায় “তরাই মহকুমা” গঠিত হয়। প্রথমদিকে এর সদর দপ্তর ছিল ফাঁসিদেওয়ার হাঁসখোয়ায়। পরে প্রশাসনিক গুরুত্ব বাড়ায় সেই দপ্তর স্থানান্তরিত হয় শিলিগুড়িতে। ১৮৯১ সালে তরাই মহকুমাকে বিলুপ্ত করে কার্শিয়াং মহকুমার সঙ্গে যুক্ত করা হলেও, ১৯০৭ সালে আবার পৃথকভাবে শিলিগুড়ি মহকুমার পুনর্গঠন করা হয়।
ব্রিটিশ প্রশাসনের কাছে পাহাড় ও সমতলের যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য শিলিগুড়ির কৌশলগত গুরুত্ব ছিল অত্যন্ত বেশি। সেই কারণেই এখানে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের অফিস স্থাপন করা হয় এবং তরাই অঞ্চলের প্রশাসনিক কাজ পরিচালিত হতো এই শহর থেকেই।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকে শিলিগুড়ি ছিল ছোট্ট এক রেল ও ব্যবসাকেন্দ্র। ১৮৭৮ সালে এখানে রেলস্টেশন গড়ে ওঠে। সেই সময় শহরের জনসংখ্যা ছিল মাত্র কয়েকশো। হিলকার্ট রোড, এস এফ রোড, মহানন্দা নদীর কাঠের সেতু—এসব নিয়েই গড়ে উঠেছিল পুরনো শিলিগুড়ি। পাহাড়ে যাওয়ার প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে ধীরে ধীরে শহরটি পরিচিতি পেতে শুরু করে “গেটওয়ে টু দ্য হিলস” নামে।
বর্তমানে শিলিগুড়ি উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক ও যোগাযোগ কেন্দ্র। ভুটান, নেপাল, উত্তর পূর্ব ভারত দার্জিলিং ও সিকিমের প্রবেশদ্বার হিসেবে এই শহরের গুরুত্ব আন্তর্জাতিক স্তরেও বৃদ্ধি পেয়েছে। সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, শহরের জনসংখ্যা প্রায় ৭ লক্ষ ৭০ হাজার এবং বৃহত্তর মেট্রোপলিটন অঞ্চলের জনসংখ্যা ১০ লক্ষ ছাড়িয়েছে।
২০১১ সালের জনগণনায় শহরের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৫ লক্ষ ১৩ হাজারের বেশি। অন্যদিকে পুরো শিলিগুড়ি মহকুমার জনসংখ্যা প্রায় ৯ লক্ষ ৭১ হাজার বলে উল্লেখ রয়েছে।এই ঐতিহাসিক দিনকে স্মরণ করতে গিয়ে ৮০ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক তথা প্রয়াত বিধায়ক ও পুরসভার চেয়ারম্যান জগদীশ চন্দ্র ভট্টাচার্যের পুত্র গৌরিশঙ্কর ভট্টাচার্য অতীতের শিলিগুড়ির নানা স্মৃতি তুলে ধরেন।
তাঁর কথায়, আজকের শিলিগুড়িতে “মল কালচার” গড়ে উঠেছে। একসময় যেখানে ভোরবেলা রাস্তায় মল বহনকারী গাড়ি চলাচল করত, আজ সেই সেবক রোড জুড়ে চোখধাঁধানো শপিং মল ও আলোর ঝলকানি। তিনি বলেন, আগে শহরে নাটক ও সিনেমা দেখার আলাদা সংস্কৃতি ছিল, এখন তার জায়গা নিয়েছে আধুনিক মাল্টিপ্লেক্স ও আইনক্স।
গৌরিশঙ্কর ভট্টাচার্যের স্মৃতিচারণে উঠে আসে পুরনো শিলিগুড়ির সামাজিক পরিবেশও। তাঁর বক্তব্য, আগে সবাই সবাইকে চিনতেন, পাড়া-প্রতিবেশীদের মধ্যে ছিল গভীর যোগাযোগ ও আন্তরিকতা। একান্নবর্তী পরিবার, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং মিলেমিশে থাকার সংস্কৃতি তখন সমাজের মূল ভিত্তি ছিল। আজকের মতো স্বার্থপরতা বা বিচ্ছিন্ন জীবনযাপন সে সময় ছিল না।
তিনি জানান, অতীতের শিলিগুড়ি ছিল শান্ত, নিরিবিলি এবং জঙ্গলে ঘেরা এক ছোট্ট জনপদ। অধিকাংশ বাড়ি ছিল কাঠ, পাতির বেড়া ও মুলিবাঁশ দিয়ে তৈরি। চারদিকে ছিল কাঁচা রাস্তা, মহিলার তো বাইরে বের হলে খালি পায়েই বের হতেন, কাঁচা নিকাশি ব্যবস্থা, খাটা পায়খানা এবং মানুষ কুয়োর জল ব্যবহার করতেন। নানা কষ্ট থাকলেও মানুষের মধ্যে আনন্দ ও পারস্পরিক সম্পর্ক ছিল গভীর।
শহরের প্রাচীন নাগরিক পরিকাঠামোর কথাও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, ১৯২৯ সালে ইউনিয়ন বোর্ডের উদ্যোগে প্রথম শিলিগুড়িতে পথবাতির ব্যবস্থা করা হয়। তখন হিলকার্ট রোড ও স্টেশন ফিডার রোডের ধারে শাল কাঠের খুঁটির ওপর ডে-লাইট ঝুলিয়ে আলো জ্বালানো হতো। সেই সময় এই রাস্তার আশপাশের অংশকেই “টাউন” বলা হতো।
ইতিহাস ঘেঁটে তিনি আরও জানান, ১৯২৫ সালে হুজরা সিং নামে এক শিখ ব্যবসায়ী শিলিগুড়িতে প্রথম পাবলিক বাস পরিষেবা চালু করেন। পরে ১৯২৬ সালে চালু হয় শিলিগুড়ি-কলকাতা ব্রডগেজ রেলপথ। প্রয়াত প্রদ্যুৎ কুমার বসুকে শিলিগুড়ি ও তরাই অঞ্চলের প্রথম সাংবাদিক হিসেবে ধরা হয়। পরবর্তীতে শিক্ষক বরদাকান্ত ভট্টাচার্য বিভিন্ন সংবাদপত্রে খবর পাঠানোর কাজ করতেন। তাঁর নামেই আজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বরদাকান্ত বিদ্যাপীঠ।
পুরনো দিনে ম্যালেরিয়া ও কালাজ্বরের প্রকোপে সাধারণ মানুষকে ভুগতে হতো বলেও উল্লেখ করেন তিনি। সেই জঙ্গলঘেরা তরাই শহরই আজ উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক রাজধানী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।এদিকে বর্তমানে শিলিগুড়িকে পৃথক জেলা করার দাবিও নতুন করে জোরালো হয়েছে। বিভিন্ন সামাজিক, ব্যবসায়ী ও নাগরিক সংগঠন ইতিমধ্যেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি জমা দিয়েছে।
দাবিদারদের বক্তব্য, বিপুল জনসংখ্যা, দ্রুত নগরায়ণ, প্রশাসনিক চাপ বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক সীমান্তের নিকটবর্তী অবস্থান এবং উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে শিলিগুড়ির বিকাশ—এই সমস্ত কারণেই শহরটিকে পূর্ণাঙ্গ জেলার মর্যাদা দেওয়া এখন সময়ের দাবি।
তাঁদের মতে, আজকের শিলিগুড়ি শুধু একটি শহর নয়, উত্তরবঙ্গের অর্থনীতি, পর্যটন, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম চালিকাশক্তি। তাই ২৫ মে-র প্রতিষ্ঠা দিবস শুধু অতীত স্মরণের দিন নয়, ভবিষ্যতের নতুন প্রত্যাশা ও পৃথক জেলার দাবিকে আরও জোরদার করারও এক আবেগঘন দিন।

