প্রিয়াঙ্কা ঘোষ : তিন দিন বন্ধ থাকে মন্দিরের দরজা, তবু থামে না ভক্তদের ঢল। দেবীর ঋতুচক্রকে ঘিরে গড়ে উঠেছে ভারতের অন্যতম বৃহৎ আধ্যাত্মিক সমাবেশ। তন্ত্রসাধনা, মাতৃশক্তি ও সৃষ্টির দর্শনের অনন্য মিলনক্ষেত্র অসমের কামাখ্যা ধাম। অম্বুবাচী শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, নারীত্ব ও সৃষ্টিশক্তির এক গভীর প্রতীক।

অসমের গৌহাটির নীলাচল পাহাড়ে অবস্থিত কামাখ্যা মন্দিরে প্রতিবছরের মতো এবারও ভক্তি, আধ্যাত্মিকতা ও তন্ত্রসাধনার আবহে পালিত হচ্ছে অম্বুবাচী মহাযোগ। ২০২৬ সালে অম্বুবাচী শুরু হয়েছে ২২ জুন এবং সমাপনী পর্ব অনুষ্ঠিত হচ্ছে ২৬ জুন। এই সময় লক্ষাধিক ভক্ত, সাধু, সন্ন্যাসী ও তন্ত্রসাধক দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কামাখ্যা ধামে সমবেত হন।
হিন্দু শাক্তধর্ম ও তান্ত্রিক বিশ্বাস অনুযায়ী, অম্বুবাচী হল দেবী কামাখ্যার বার্ষিক ঋতুচক্রের প্রতীক। বিশ্বাস করা হয়, এই তিন দিন দেবী রজঃস্বলা অবস্থায় থাকেন। সেই কারণে মন্দিরের গর্ভগৃহ বন্ধ রাখা হয় এবং নিয়মিত পূজা ও দর্শন স্থগিত থাকে। চতুর্থ দিনে বিশেষ শুদ্ধিকরণ ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পুনরায় মন্দিরের দ্বার খুলে দেওয়া হয়।
ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি এই উৎসবের রয়েছে গভীর দার্শনিক তাৎপর্য। অম্বুবাচী নারীত্ব, উর্বরতা, সৃষ্টিশক্তি এবং প্রকৃতির পুনর্জাগরণের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। তান্ত্রিক দর্শনে ঋতুচক্রকে অপবিত্র নয়, বরং সৃষ্টির মূল শক্তির প্রকাশ হিসেবে দেখা হয়। তাই মাতৃশক্তির আরাধনায় এই উৎসবের গুরুত্ব অপরিসীম।
কামাখ্যা মন্দির ভারতের ৫১টি শক্তিপীঠের অন্যতম এবং শাক্ত উপাসনার এক প্রধান কেন্দ্র। পুরাণ অনুযায়ী, দেবী সতীর দেহের যোনি অংশ এই স্থানে পতিত হয়েছিল। সেই কারণেই কামাখ্যা শক্তি, সৃষ্টি ও নারীত্বের এক অনন্য প্রতীক হিসেবে পূজিত হয়ে আসছে যুগের পর যুগ।
মন্দিরের আরেকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল, এখানে দেবীর কোনও প্রচলিত মূর্তি নেই। গর্ভগৃহে অবস্থিত একটি প্রাকৃতিক শিলাখণ্ড ও ঝরনাধারাকেই দেবীর রূপ হিসেবে পূজা করা হয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই স্থান তন্ত্রসাধনার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
অম্বুবাচী মেলার সঙ্গে কামাখ্যা মন্দিরের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। দেবীর ঋতুকাল শেষ হওয়ার পর মন্দির পুনরায় খোলার সময় ভক্তদের মধ্যে ‘অঙ্গোদক’ (পবিত্র জল) এবং ‘অঙ্গবস্ত্র’ (লাল বস্ত্রের অংশ) প্রসাদ হিসেবে বিতরণ করা হয়। ভক্তদের বিশ্বাস, এগুলি দেবীর আশীর্বাদ ও শক্তির প্রতীক।
আজকের দিনে অম্বুবাচী শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি নারীত্বের মর্যাদা, মাতৃশক্তির বন্দনা এবং প্রকৃতির সৃষ্টিশীল শক্তির প্রতি গভীর শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ। প্রতিবছর এই উৎসব নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়—সৃষ্টি, শক্তি ও জীবনের উৎসকে সম্মান জানানোই ভারতীয় আধ্যাত্মিকতার অন্যতম মূল বার্তা।
কামাখ্যা ধাম, গৌহাটি থেকে প্রতিবেদন: প্রিয়াঙ্কা ঘোষ, খবরের ঘন্টা।
জয় মা কামাখ্যা।

