নিজস্ব প্রতিবেদন : শহরের ব্যস্ততা, কংক্রিটের জঙ্গল আর অর্থ উপার্জনের দৌড়ে যখন অধিকাংশ মানুষ ছুটে চলেছেন, তখন শিলিগুড়ি হায়দরপাড়ার ৭৭ বছর বয়সী অর্ধেন্দু দে যেন এক অন্য পথের মানুষ। নিজের পাকা বাড়ির নিচতলা থেকে চারতলা, সিঁড়ি থেকে ছাদ—পুরো বাড়িটাই তিনি ভরিয়ে তুলেছেন অসংখ্য টব ও নানা প্রজাতির গাছে। চারদিকে তাকালেই চোখে পড়ে এক টুকরো সবুজের মেলা।

অর্কিড, ক্যাকটাস, ফেলোনপসিস, ডেনডিবিয়াস, ভেন্ডা, ক্যাটেনিলা, হুয়া, ক্রিসমাস ক্যাকটাস, অ্যানাথোরিয়াস—এমন বহু প্রজাতির গাছ তাঁর সযত্ন পরিচর্যায় বেড়ে উঠছে। এলআইসি-র চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর এই গাছগুলিই যেন হয়ে উঠেছে তাঁর জীবনের প্রধান সঙ্গী। প্রতিদিন নিজের হাতে গাছে জল দেওয়া, খাবার দেওয়া, ওষুধ দেওয়া—সব কাজই তিনি একাই করেন।
অর্ধেন্দুবাবুর কথায়, “গাছেরা আমার প্রাণ। সকাল-সন্ধ্যা ওদের সঙ্গে সময় না কাটালে আমার ভালো লাগে না।” তাঁর বিশ্বাস, অর্থ দিয়ে সব কিছু পাওয়া যায় না। গাছের মধ্যে যে ভালোবাসা, শান্তি আর অকৃত্রিম আনন্দ তিনি খুঁজে পান, তা কোনো অর্থের বিনিময়ে কেনা সম্ভব নয়। বরং নিজের পেনশনের টাকাই তিনি ব্যয় করেন এই সবুজ সংসারের পিছনে।
বর্তমান সময়ে যেখানে অনেকে বহুতল তৈরি করে ফ্ল্যাট বিক্রি বা ভাড়া দিয়ে অর্থ উপার্জনের দিকে ঝুঁকছেন, সেখানে অর্ধেন্দু দে নিজের গোটা বিল্ডিং জুড়ে তৈরি করেছেন এক অনন্য সবুজ পরিবেশ। তাঁর এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ দেখে বাড়ির সদস্য থেকে পরিচারিকা—সকলেই খুশি ও মুগ্ধ।
বাড়িতে রয়েছেন তাঁর স্ত্রী। এক ছেলে ও পুত্রবধূ কর্মসূত্রে বাইরে থাকেন। নিচতলায় রয়েছেন এক ভাড়াটিয়া। অনেকটা নিঃসঙ্গ সময়ের সঙ্গী হয়ে উঠেছে এই গাছগুলিই। তবে এই ভালোবাসা শুধুই আবেগের বিষয় নয়, এর পিছনে রয়েছে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গাছপালার মধ্যে সময় কাটালে মানুষের শরীরে স্ট্রেস হরমোন কর্টিসলের মাত্রা কমে যায়। ফলে উদ্বেগ, হতাশা ও মানসিক ক্লান্তি অনেকটাই হ্রাস পায়। বিশেষ করে বৃদ্ধ বয়সে যখন একাকীত্ব বাড়তে পারে, তখন গাছ মানুষের নীরব সঙ্গী হয়ে ওঠে।
জাপানের “ফরেস্ট বাথিং” নিয়ে হওয়া গবেষণায়ও দেখা গিয়েছে, সবুজ পরিবেশে সময় কাটালে হৃদস্পন্দন ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে, মন শান্ত হয়। আবার প্রতিদিন গাছে জল দেওয়া, টব সরানো, মাটি খোঁড়া বা শুকনো পাতা পরিষ্কার করার মতো কাজ শরীরকে সচল রাখে। এতে রক্ত চলাচল ভালো থাকে এবং জয়েন্ট শক্ত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও কমে।
ছাদে গাছের সঙ্গে সময় কাটানোর ফলে নিয়মিত সূর্যের আলোও পান অর্ধেন্দুবাবু। এতে শরীরে ভিটামিন ডি তৈরি হয়, যা হাড় মজবুত রাখতে সাহায্য করে। সকালের সূর্যালোক মস্তিষ্কে সেরোটোনিনের মাত্রা বাড়িয়ে মানুষকে সতেজ ও আনন্দিত অনুভব করায়।
গাছপালা বাতাস থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে অক্সিজেন ছাড়ে এবং পরিবেশকে তুলনামূলকভাবে ঠান্ডা ও নির্মল রাখে। ফলে শ্বাসপ্রশ্বাস ভালো হয় এবং শরীরেও সতেজতা আসে। মনোবিজ্ঞানে “বায়োফিলিয়া” নামে একটি ধারণাও রয়েছে, যেখানে বলা হয় মানুষ স্বাভাবিকভাবেই প্রকৃতি ও সবুজের প্রতি আকৃষ্ট হয়। গাছের দিকে তাকালেই মানুষের মস্তিষ্কে শান্তি ও প্রশান্তির অনুভূতি তৈরি হয়।
মানুষের অনুভূতি, প্রকৃতি ও প্রতীকের মধ্যেও রয়েছে এক গভীর সম্পর্ক। যেমন পানপাতার আকৃতির মধ্যে মানুষ হৃদয়ের ছায়া খুঁজে পেয়েছে বহু আগে থেকেই। উপমহাদেশের সংস্কৃতিতে পান শুধু খাবার নয়, ভালোবাসা, সম্মান ও আন্তরিকতার প্রতীক হিসেবেও পরিচিত। বিয়ে, পূজা কিংবা অতিথি আপ্যায়নে পান যেন সম্পর্কের উষ্ণতার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
বিজ্ঞান বলছে, সবুজ গাছপালা ও প্রকৃতির সংস্পর্শে থাকলে মানুষের মস্তিষ্কে ডোপামিন ও সেরোটোনিনের মতো হরমোনের নিঃসরণ বাড়ে। এতে মন ভালো থাকে, উদ্বেগ কমে এবং এক ধরনের মানসিক শান্তি তৈরি হয়। অনেক সময় বয়স্ক মানুষের কাছে গাছ সন্তানের মতো হয়ে ওঠে। প্রতিদিন তাদের যত্ন নেওয়া, নতুন পাতা দেখা বা শুকিয়ে গেলে মন খারাপ হওয়া—এসবের মধ্যেই গড়ে ওঠে এক গভীর আবেগের সম্পর্ক।
তাই অর্ধেন্দু দে যখন বলেন, “এই গাছগুলোই আমার ভালোবাসা, আমার হৃদয়,” তখন সেটি নিছক কাব্যিক কথা নয়। এর পিছনে রয়েছে মানুষের চিরন্তন মানসিক সত্য—মানুষ ভালোবাসতে চায়, আর প্রকৃতি সেই ভালোবাসার সবচেয়ে নীরব ও অকৃত্রিম সঙ্গী।

