নিজস্ব প্রতিবেদক : পরিবেশ দূষণ, ফাস্ট ফুড ও অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন কি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বিপদ ডেকে আনছে? নারী-পুরুষ উভয়ের হরমোনের ভারসাম্য ও প্রজনন ক্ষমতার ওপর বাড়ছে নানা নেতিবাচক প্রভাব। চিকিৎসক দিবসের প্রাক্কালে এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেন উত্তরবঙ্গের বিশিষ্ট স্ত্রী রোগ বিশেষজ্ঞ তথা শিলিগুড়ি আশ্রমপাড়ার নিউ রামকৃষ্ণ সেবা সদনের প্রধান কর্নধার ডাঃ জি বি দাস।

সচেতন জীবনযাপন ও সুষম খাদ্যাভ্যাসের ওপর জোর দিলেন তিনি।পরিবেশ দূষণ, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন এবং আধুনিক জীবনযাত্রার নানা সমস্যার কারণে নারী-পুরুষ উভয়ের প্রজনন ক্ষমতা ও হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রম প্রভাবিত হচ্ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করলেন শিলিগুড়ি তথা উত্তরবঙ্গের বিশিষ্ট স্ত্রী রোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ জি বি দাস।
ডাঃ দাস বলেন, “বর্তমানে বায়ুদূষণ, জলদূষণ এবং অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহার করে উৎপাদিত খাদ্যদ্রব্য মানুষের শরীরে নানা ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এর ফলে পুরুষদের শুক্রাণুর সংখ্যা ও গুণগত মান কমতে পারে। অন্যদিকে নারীদের ডিম্বাণুর গুণগত মান, মাসিক চক্র এবং গর্ভধারণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াও প্রভাবিত হতে পারে।”
তিনি জানান, আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে বায়ুতে থাকা সূক্ষ্ম দূষিত কণা, ভারী ধাতু এবং বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ শরীরে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস ও প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে। একইসঙ্গে কিছু কীটনাশক, প্লাস্টিকজাত রাসায়নিক এবং শিল্পবর্জ্য থেকে তৈরি বিভিন্ন উপাদান শরীরের হরমোন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করতে পারে।
ডাঃ জি বি দাসের কথায়, “মোবাইল ফোনকে সরাসরি বন্ধ্যাত্বের কারণ বলা না গেলেও অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম, রাত জেগে মোবাইল ব্যবহার এবং ঘুমের ঘাটতি শরীরের হরমোন উৎপাদনের স্বাভাবিক ছন্দকে ব্যাহত করতে পারে। এর ফলে মানসিক চাপ বাড়ে এবং প্রজনন স্বাস্থ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে ফাস্ট ফুড ও অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়ার প্রবণতা উদ্বেগজনক। এর ফলে স্থূলতা, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স এবং হরমোনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হচ্ছে। নারীদের ক্ষেত্রে পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (PCOS)-এর ঝুঁকি বাড়ছে, আর পুরুষদের ক্ষেত্রে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা ও শুক্রাণুর গুণগত মান কমে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।”
তবে বাজারের সবজি বা ফল খাওয়াতেই প্রজনন ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়—এমন ধারণা সঠিক নয় বলেও স্পষ্ট করেছেন তিনি। তাঁর মতে, “সমস্যা তৈরি হতে পারে তখনই, যখন দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত কীটনাশক বা রাসায়নিক অবশিষ্টাংশ শরীরে প্রবেশ করে। তাই ফল ও শাকসবজি ভালোভাবে ধুয়ে খাওয়া এবং তাজা ও মৌসুমি খাদ্য বেছে নেওয়া উচিত।”
ডাঃ দাসের পরামর্শ, সুস্থ প্রজনন স্বাস্থ্য বজায় রাখতে নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাদ্য গ্রহণ, ধূমপান ও তামাক বর্জন, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং দূষণের সংস্পর্শ যতটা সম্ভব কমানো প্রয়োজন।চিকিৎসক দিবসের প্রাক্কালে তিনি বলেন, “আজকের প্রজন্মের সুস্থ ভবিষ্যতের জন্য এখনই সচেতন হতে হবে। পরিবেশ, খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাত্রা—এই তিন ক্ষেত্রেই ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারলে অনেক স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়ানো সম্ভব হবে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রজনন ক্ষমতা হ্রাসের জন্য একটি মাত্র কারণ দায়ী নয়। পরিবেশগত প্রভাব, খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাপন, বয়স ও জিনগত বৈশিষ্ট্য—সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাবেই এই সমস্যা তৈরি হতে পারে। তাই সচেতনতাই হতে পারে সুস্থ ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।

