নিজস্ব প্রতিবেদক : পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৯ মে ২০২৬ এক বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ দিন হয়ে উঠতে চলেছে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ। কারণ, এই দিনেই রাজ্যে প্রথমবার ভারতীয় জনতা পার্টির সরকার শপথ গ্রহণ করতে চলেছে বলে জোর রাজনৈতিক আলোচনা শুরু হয়েছে। আর এই ঘটনাকে ঘিরেই নতুন করে উঠে আসছে ডঃশ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির নাম ও আদর্শ।

বাংলার বাঘ নামে পরিচিত বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের পুত্র ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। শিক্ষাবিদ, রাজনীতিবিদ ও জাতীয়তাবাদী চিন্তার ধারক হিসেবে তিনি ভারতীয় রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রচনা করেছিলেন। মাত্র ৩৩ বছর বয়সে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি নজির সৃষ্টি করেন। বাংলা ভাষা, ভারতীয় সংস্কৃতি এবং জাতীয় চেতনার সঙ্গে শিক্ষাকে যুক্ত করার পক্ষে তিনি ছিলেন স্পষ্ট অবস্থানে।
স্বাধীন ভারতের প্রথম শিল্প ও সরবরাহ মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি। পরবর্তীকালে মতাদর্শগত কারণে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা থেকে বেরিয়ে এসে ১৯৫১ সালে ভারতীয় জনসংঘ প্রতিষ্ঠা করেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সেই জনসংঘের আদর্শিক ভিত্তির উপর দাঁড়িয়েই পরবর্তীকালে গড়ে ওঠে বর্তমান ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি।
এই কারণেই বাংলায় বিজেপির সম্ভাব্য প্রথম সরকার গঠনের প্রাক্কালে পুরনো বিজেপি কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে ঘিরে আবেগ ও আলোচনার মাত্রা বাড়ছে। বিশেষত মে মাস তাঁর রাজনৈতিক জীবনের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৫৩ সালের মে মাসে “এক দেশ, এক সংবিধান” দাবিকে সামনে রেখে তিনি জম্মু-কাশ্মীরে প্রবেশ করেছিলেন। সেই আন্দোলন ও পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসে এখনও অত্যন্ত আলোচিত অধ্যায়।
অন্যদিকে, ৯ মে-র আবহের সঙ্গেই মিশে রয়েছে ২৫শে বৈশাখের সাংস্কৃতিক আবেগ। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মজয়ন্তী ঘিরে বাংলার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল প্রতি বছরই এক বিশেষ আবহ তৈরি করে। এই পরিস্থিতিতে একদিকে রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদী ও সাংস্কৃতিক দর্শন, অন্যদিকে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জাতীয় ঐক্য ও সাংবিধানিক চেতনা— দুই ধারাকেই নতুনভাবে আলোচনায় আনছে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট।
ইতিহাসবিদদের মতে, দু’জনের ভাবধারায় পার্থক্য থাকলেও শিক্ষা, বাংলা সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের প্রশ্নে কিছু গুরুত্বপূর্ণ মিলও খুঁজে পাওয়া যায়। রবীন্দ্রনাথ যেমন বিশ্বভারতীর মাধ্যমে ভারতীয় সংস্কৃতিকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরেছিলেন, তেমনি শ্যামাপ্রসাদও উচ্চশিক্ষায় বাংলা ভাষা ও ভারতীয় ভাবনাকে মর্যাদা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, যদি সত্যিই ৯ মে বাংলায় নতুন বিজেপি সরকার শপথ নেয়, তবে তা কেবল একটি রাজনৈতিক পালাবদল হিসেবেই নয়, বরং ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মতাদর্শের এক প্রতীকী সমাপতন হিসেবেও চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
শেষ পর্যন্ত, মে মাসের এই আবহ যেন বাংলাকে আবার মনে করিয়ে দিচ্ছে— রাজনীতি শুধুই ক্ষমতার অঙ্ক নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ইতিহাস, সংস্কৃতি, আবেগ ও আত্মপরিচয়ের দীর্ঘ পথচলাও।

