নিজস্ব প্রতিবেদক : শিলিগুড়ি ও উত্তরবঙ্গের অন্যতম আধ্যাত্মিক কেন্দ্র সাহুডাঙি রামকৃষ্ণ আশ্রম বহুদিন ধরেই শান্ত, সবুজ পরিবেশে ভক্তি, সাধনা ও সেবার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে আসছে।ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ, স্বামী বিবেকানন্দ এবং মা সারদা দেবী-র আদর্শে পরিচালিত এই আশ্রম শুধু ধর্মীয় অনুশীলনের ক্ষেত্র নয়, বরং মানবকল্যাণের এক নিবেদিত প্রতিষ্ঠান।

প্রতিদিন দূরদূরান্ত থেকে অসংখ্য ভক্ত এখানে আসেন সাধন-ভজন, প্রার্থনা এবং সেবামূলক কাজে অংশ নিতে। পাশাপাশি আশ্রমের উদ্যোগে সারা বছর ধরে চলে নানা সামাজিক কর্মকাণ্ড—শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও মানবিক সহায়তা। আশ্রম সংলগ্ন সাহুডাঙি ও আশপাশের গ্রামের বহু মানুষ এই সেবার মাধ্যমে উপকৃত হন। আশ্রম চত্বরে থাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ছোটদের মধ্যে নৈতিক শিক্ষা ও মূল্যবোধেরও বিকাশ ঘটানো হচ্ছে, যা সমাজ গঠনের এক গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
তবে এই শান্ত পরিবেশেই সম্প্রতি নেমে এসেছে উদ্বেগজনক ছায়া। আশ্রম পরিচালিত স্কুলে বৈদ্যুতিক ওয়্যারিংয়ের কাজ চলছিল, যা নির্বাচনী ব্যস্ততার কারণে কিছুটা অসম্পূর্ণ অবস্থায় ছিল। সেই সুযোগেই মঙ্গলবার দুষ্কৃতীরা স্কুল প্রাঙ্গণে ঢুকে বৈদ্যুতিক তার কেটে নিয়ে যায়। এমনকি জলের পাম্পের তারও তারা চুরি করে নেয়, যার ফলে বুধবার থেকে আশ্রমে তীব্র জলসংকট দেখা দেয়।
আশ্রমের সম্পাদক স্বামী নরেশানন্দ মহারাজ জানিয়েছেন, বিষয়টি পুলিশকে জানানো হয়েছে এবং তদন্তও শুরু হয়েছে। তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এ ধরনের ঘটনা শুধু আশ্রমের ক্ষতি করে না, বরং সমাজসেবার ধারাকেও ব্যাহত করে। এর আগেও একাধিকবার প্রণামী বাক্স চুরি ও তার কাটার মতো ঘটনা ঘটেছে, যা ক্রমেই চিন্তার কারণ হয়ে উঠছে।
এই ঘটনার মধ্য দিয়ে একটি বড় প্রশ্ন সামনে আসে—যে প্রতিষ্ঠান সমাজের কল্যাণে নিরলসভাবে কাজ করে, সেই প্রতিষ্ঠান যদি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, তবে তার প্রভাব গোটা সমাজেই পড়ে। সাধুদের সান্নিধ্য বা সৎসঙ্গ মানুষের চেতনাকে উন্নত করে, মনকে শান্ত করে এবং নৈতিকতার পথে পরিচালিত করে। শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছিলেন, “সৎসঙ্গ করলে মানুষের মন ঈশ্বরের দিকে যায়, আর অসৎসঙ্গ মানুষকে পতনের দিকে ঠেলে দেয়।” অন্যদিকে স্বামী বিবেকানন্দ-এর বাণী আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, “জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।”
এই আদর্শই সাহুডাঙি আশ্রমের প্রতিটি কার্যকলাপের মূলে রয়েছে। অথচ কিছু অসাধু মানুষের লোভ ও অবিবেচনার কারণে সেই সেবার পথ বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষই—যারা আশ্রমের সেবা ও সহযোগিতার উপর নির্ভরশীল।
এমন পরিস্থিতিতে প্রয়োজন শুধু প্রশাসনিক ব্যবস্থা নয়, সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সচেতনতা ও দায়িত্ববোধ। আশ্রম কেবল একটি ধর্মীয় স্থান নয়, এটি সমাজের নৈতিক ও মানবিক শক্তির এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। তাই এই ধরনের চুরি বা নাশকতা রোধে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
সাধুদের সুরক্ষা মানে শুধু একটি আশ্রমকে রক্ষা করা নয়, বরং সমাজের মানবিক ভিত্তিকে অটুট রাখা। যদি আমরা সজাগ না হই, তবে ক্ষতিটা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়—পুরো সমাজের।

